মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

গ্রাম আদালত

১। গ্রাম আদালত কি?

উত্তরঃ- বৃটিশদের আগমণের পূর্বে এদেশে পঞ্চায়েত নামে যে সংস্থা প্রচলিত ছিল তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল বিচার কার্য সম্পাদন ও ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করা। বৃটিশরা যদিও প্রথমে এ দায়িত্ব স্থানীয় সংস্থার উপর অর্পণ করেনি কিন্তু বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগেই ১৯১৯ সালের পল্লী স্বায়ত্ব শাসন আইনের মাধ্যমে ইউনিয়ন বোর্ডকে দেওয়ানী ও ফৌজদারী উভয় প্রকার মামলার বিচার করার এখতিয়ার দেয়া হয়। আমাদের দেশের দরিদ্র জনসাধারণের অধিকাংশই গ্রামে বাস করে। এ দরিদ্র জনসাধারণের পক্ষে শহরে গিয়ে দীর্ঘ দিন মামলা-মোকর্দ্দমা চালানো অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার; সুতরাং গ্রাম পর্যায়ে যদি ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা ও মামলা মোকর্দ্দমা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকে তাহলে তারা অনেক বিড়ম্বনা ও খরচের হাত থেকে অব্যাহতি লাভ করতে পারে। দ্রুত বিচার কার্যের ফলে ঝগড়া-বিবাদের তীব্রতা ও ব্যাপকতা বহুলাংশে কমে যায় এবং তা গ্রামের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর প্রথম কয়েক বছর যদিও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় বিচার কার্য করার কোন ক্ষমতা ছিল না; কিন্তু গ্রাম আদালত অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ এবং পরবর্তীতে ২০০৬ সালের গেজেট এর মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে পুনরায় বিচার কার্য সম্পাদনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিচার নিষ্পত্তিমূলক ও সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যেই এ আদালত প্রবর্তন করা হয়েছে।

২। গ্রাম আদালতের গঠনঃ-

একজন চেয়ারম্যান এবং বিবাদের প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত দু'জন সদস্য নিয়ে মোট ৫ জন সদস্যের সমন্বয়ে গ্রাম আদালত গঠিত হয়। প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত দু'জন সদস্যের একজন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হবেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান হবেন। তবে প্রকাশ থাকে যে, অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, গ্রাম আদালতে দায়েরকৃত কোন মামলা পরিচালনার জন্য কোন পক্ষ কোন আইনজীবি নিয়োগ/মনোনীত করিতে পারিবেন না।

তবে যদি চেয়ারম্যান কোন কারণ বশতঃ তাঁর দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হন, কিংবা তাঁর নিরপেক্ষতা সম্পর্কে আপত্তি ওঠে তাহলে পরিষদের অন্য কোন সদস্য আদালতের চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করবেন। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন পক্ষ সদস্য মনোনয়ন দিতে ব্যর্থ হন তবে উক্ত মনোনয়ন ছাড়াই আদালত বৈধভাবে গঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে। যদি কোন পক্ষ ইউনিয়ন পরিষদের কোন সদস্যকে পক্ষপাতিত্বের কারণে মনোনীত করতে না পারেন তাহলে চেয়ারম্যানের অনুমতিক্রমে অন্য কোন ব্যক্তিকে মনোনীত করা যাবে।

৩। গ্রাম আদালতের এখতিয়ারঃ-

(ক) যে ইউনিয়নে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বা যেখানে অপরাধের কারণের উদ্ভব হয়েছে সে ইউনিয়নের ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে গ্রাম আদালত সীমাবদ্ধ থাকবে।

(খ) যখন কোন অপরাধ এক ইউনিয়নে সংঘটিত হয়েছে কিন্তু অপরাধীগণ অন্য ইউনিয়নের বাসিন্দা তখন যে ইউনিয়নে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সে ইউনিয়নে গ্রাম আদালত গঠিত হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয় তাদের স্ব-স্ব ইউনিয়ন হতে সদস্য মনোনয়ন দিতে পারবেন।

৪। গ্রাম আদালতের ক্ষমতাঃ-

(ক) গ্রাম আদালত অবমাননা বা সমন অস্বীকার করা ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে জরিমানা বা জরিমানা অনাদায়ে জেল প্রদান করতে পারবে না। কিন্তু বিচারযোগ্য ফৌজদারী অপরাধ সমূহের বিচারে কেউ যদি দোষী সাব্যস্ত হন তবে আদালত দোষী ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দানের আদেশ দিতে পারেন। কিন্তু ক্ষতিপূরণ কোন ভাবেই ২৫,০০০/- (পঁচিশ হাজার) টাকার উর্দ্ধে হবে না।

(খ) দেওয়ানী মামলার গ্রাম আদালত কোন ব্যক্তির প্রাপ্য টাকা পরিশোধ অথবা সম্পত্তির প্রকৃত মালিককে সম্পত্তি বা তার দখল প্রত্যার্পণ করার আদেশ দিতে পারেন।

৫। গ্রাম আদালতের কার্যপদ্ধতিঃ- 

গ্রাম আদালত কর্তৃক বিচারযোগ্য মামলার ক্ষেত্রে বিবাদের যে কোন পক্ষ বিচার চেয়ে গ্রাম আদালত গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট ৪.০০(চার) টাকা (দেওয়ানী মামলা হলে) অথবা ২.০০(দুই) টাকা (ফৌজদারী মামলা হলে) ফি দিয়ে আবেদন করতে পারেন। আবেদন পত্রে নিম্ন লিখিত বিবরণাদি থাকতে হবেঃ-

(ক) যে ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করা হচ্ছে তার নাম;

(খ) আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়;

(গ) বিবাদীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়;

(ঘ) যে ইউনিয়নে অপরাধ ঘটেছে অথবা মামলার কারণের সৃষ্টি হয়েছে তার নাম;

(ঙ) সংক্ষিপ্ত বিবরণাদিসহ অভিযোগ বা দাবীর প্রকৃতি ও পরিমাণ;

(চ) প্রার্থীত প্রতিকার;

(ছ) আবেদনকারী লিখিত আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করবেন।

উল্লেখ্য যে, কোন অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন আবেদন করা যাবে না। চেয়ারম্যান অভিযোগ অমূলক মনে করলে আবেদন নাকচ করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে নাকচের কারণ লিখে আবেদনপত্র আবেদনকারীকে ফেরত দিতে হবে।

নাকচের আদেশ অসৎ উদ্দেশ্য দেয়া হয়েছে বা মূলত অন্যায় করা হয়েছে এ কারণ দেখিয়ে বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি আবেদন অগ্রাহ্য করার তারিখ হতে ৩০(ত্রিশ) দিনের মধ্যে পুনঃ বিবেচনার জন্য যথাযথ এখতিয়ার সম্পন্ন সহকারী জজের (মুন্সেফ) নিকট আবেদন করতে পারেন। সহকারী জজ (মুন্সেফ) যদি মনে করেন যে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান যে আদেশ দিয়েছেন তা অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত বা যথার্থই অন্যায় তাহলে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে আবেদনপত্র গ্রহণ করার জন্য লিখিত নির্দেশ দিয়ে আবেদনকারীকে তা ফেরত দিবেন। 

আবেদনপত্র গৃহীত হলে ১ নং ফরমে রক্ষিত রেজিষ্টার বহিতে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে। রেজিষ্ট্রী করার পর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তারিখ ও সময় নির্দিষ্ট করে আবেদনকারীকে উপস্থিত হতে নির্দেশ দিবেন এবং বিবাদীকেও অনুরূপ নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় হাজির হবার জন্য সমন দিবেন। যে ব্যক্তিকে সমন দেয়া হবে, সে ব্যক্তির নিকট তা পাঠিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সমন জারী করতে হবে। সমনের অন্য প্রস্তের উল্টো পৃষ্ঠায় সমন প্রাপক প্রাপ্তি সূচক স্বাক্ষর দান করবেন। যদি সমন ব্যক্তিগতভাবে জারী করা সম্ভব না হয় তাহলে সমন জারী কারক কর্মচারী সমনের এক প্রস্ত বিবাদীর বসত বাড়ীর কোন প্রকাশ্য স্থানে লটকিয়ে দিবেন এবং এতদ্বারা সমন যথাযথভাবে জারী করা হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার বাইরে বসবাসরত ব্যক্তিকে রেজিষ্ট্রী ডাকযোগে (প্রাপ্তি বিচারপত্র সহ) সমন পাঠাতে হবে। বিবাদীর নিকট ২ নং ফরমে সমন পাঠাতে হবে। সমন জারীর জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, তা বাদীকে বহন করতে হবে। সমন জারী করার ৭(সাত) দিনের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পক্ষদ্বয়কে তাদের সদস্য মনোনীত করতে বলবেন এবং তাদের মনোনীত সদস্য নিয়ে চেয়ার‌ম্যান গ্রাম আদালত গঠন করবেন। গ্রাম আদালত গঠিত হবার পর চেয়ারম্যান বিবাদীকে ৩(তিন) দিনের মধ্যে আবেদনের বিরুদ্ধে তার লিখিত আপত্তি দাখিল করার জন্য নির্দেশ দিবেন। গ্রাম আদালতের অধিবেশনের তারিখ ও সময় নির্ধারিত করে পক্ষদ্বয়কে নিজ নিজ মামলার সমর্থনে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষী আনয়ন করার জন্য চেয়ারম্যান নির্দেশ দিবেন। চেয়ারম্যান নির্ধারিত তারিখে মামলার বিচার করবেন। গ্রাম আদালত সময়ে সময়ে শুনানী মূলতবী রাখতে পারে। কিন্তু মূলতবীর মেয়াদ কোনভাবেই ৭(সাত) দিনের বেশী হবে না। চেয়ারম্যান স্বাক্ষীকে শপথ করিয়ে তার বক্তব্য রাখার জন্য বলবেন এবং তার বক্তব্যের সারমর্ম লিপিবদ্ধ করবেন বা করাবেন। বিচারে যে কোন পর্যায়ে গ্রাম আদালত স্থানীয়ভাবে তদন্ত করতে পারেন।

যদি আবেদনকারী নির্ধারিত তারিখে হাজির হতে ব্যর্থ হন এবং চেয়ারম্যান যদি মনে করেন আবেদনকারী মামলা পরিচালনায় অবহেলা করছেন তাহলে তিনি আবেদন নাকচ করতে পারেন। নাকচ হবার ১০(দশ) দিনের মধ্যে আবেদনকারী পূর্নবহালের জন্য লিখিতভাবে চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন করলে চেয়ারম্যান আবেদনটি পূর্নবহাল করে মামলার তারিখ নির্দিষ্ট করবেন।

অনুরূপভাবে বিবাদীর অবহেলাজনিত অনুপস্থিতির কারণে তার অনুপস্থিতিতেই চেয়ারম্যান মামলার শুনানী ও নিষ্পত্তি করবেন। এক্ষেত্রে ১০(দশ) দিনের মধ্যে বিবাদী চেয়ারম্যানের নিকট লিখিতভাবে প্রতিকারের জন্য আবেদন করবেন। অনুপস্থিতির কারণ সন্তোষজনক বলে প্রতীয়মাণ হলে চেয়ারম্যান মামলাটি পূর্নবহাল করে পূনঃ শুনানীর জন্য তারিখ ধার্য করবেন।

৬। গ্রাম আদালতের সিদ্ধান্তঃ-

গ্রাম আদালতের রায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে, যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারা সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে, তার অনুপাত রায়ে অবশ্যই উল্লেখ থাকবে। রায়ের পর ৪ নং ফরমে একটি ডিক্রী প্রস্তুত করতে হবে।

গ্রাম আদালতে সিদ্ধান্ত যদি সর্বসম্মত বা চার এক ভোটে গৃহীত হয় তাহলে উক্ত সিদ্ধান্ত পক্ষদ্বয়ের উপর বাধ্যতামূলক হবে এবং সেক্ষেত্রে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনরূপ আপীল চলবে না।

যদি তিন-দুই এ কোন সিদ্ধান্ত হয় তবে সে সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক হবে না। সিদ্ধান্ত ঘোষণার ৩০(ত্রিশ) দিনের মধ্যে যে কোন পক্ষ ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিষ্ট্রেট (কগনিজেন্স আদালত) এবং দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রে সহকারী জজ (মুন্সেফ) এর আদালতে আপীল করতে পারবেন।

গ্রাম আদালত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডিক্রী বা ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানের নির্দেশ দিবেন তবে তা ৬(ছয়) মাসের অধিক হবে না।

৭। গ্রাম আদালতের আদেশ (ডিক্রী) বলবৎকরণঃ-

চেয়ারম্যান ৫ নং ফরমে ডিক্রী রেজিষ্টারে ডিক্রী লিপিবদ্ধ করবেন। গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য ডিক্রী দেবার পর নির্ধারিত তারিখের মধ্যে ডিক্রী বাবদ অর্থ জমা না দিলে গ্রাম আদালত ডিক্রীটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এর নিকট প্রেরণ করবেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বকেয়া কর আদায়ের পদ্ধতি অনুসরণ করে ডিক্রীর অর্থ আদায় করে ডিক্রীদারকে প্রদান করবেন।

কিন্তু উল্লেখ্য যে, আর্থিক ক্ষতিপূরণ ছাড়া অন্য কোন কিছু ক্ষতিপূরণ হিসাবে প্রদানের জন্য গ্রাম আদালত ডিক্রী প্রদান করলে, গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান ডিক্রীটি এখতিয়ার সম্পন্ন সহকারী জজ (মুন্সেফ) এর নিকট কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করবেন। সহকারী জজ (মুন্সেফ) উক্ত ডিক্রী কার্যকরীর বিষয়ে এমণভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন যেন তার আদালতই ডিক্রীটি প্রদান করেছেন।

৮। গ্রাম আদালতের জরিমানাঃ-

আইন সঙ্গত কারণ ছাড়া নিম্নলিখিত অপরাধের জন্য কোন ব্যক্তি গ্রাম আদালত অবমাননার দোষে দোষী হতে পারেনঃ-

(ক) আদালত চলাকালীন আদালতকে বা তার কোন সদস্যকে কাজ চলাকালে অপমান করা।

(খ) আদালতের কোন কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা।

(গ) আদালতের কোন বৈধ প্রশ্নের উত্তর দানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন।

(ঘ) আদালতের আদেশ সত্ত্বেও কোন দলিল দাখিল বা অর্পণ করতে ব্যর্থ হওয়া।

(ঙ) সত্য কথা বলার জন্য শপৎ নিতে অস্বীকার বা আদালতের নির্দেশানুসারে প্রদত্ত জবানবন্দীতে দস্তখত করতে অস্বীকার করা।

উল্লিখিত যে কোন একটি অপরাধের জন্য গ্রাম আদালত সংশ্লিষ্ট অপরাধীকে তার কৃত অপরাধের জন্য ৫০০/- (পাঁচশত) টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন। বিচারের স্বার্থে গ্রাম আদালতে যে কোন ব্যক্তিকে হাজির হতে/সাক্ষ্য দিতে/দলিল দাখিল করতে সমন দিতে পারে। আইন সঙ্গত অজুহাত ব্যতিরেকে সমন প্রাপ্ত ব্যক্তি আদালতে হাজির হতে বা রাষ্ট্রীয় গোপনীয় নয় এমন দলিলাদি দাখিল করতে ব্যর্থ হলে তাকে বক্তব্য পেশের সুযোগ দেবার পর সংশ্লিষ্ট আদালত উক্ত ব্যক্তিকে অনধিক ২৫০/- (দুইশত পঞ্চাশ) টাকা জরিমানা করতে পারেন।

৯। জরিমানা আদায়ঃ-

আদালত অবমাননা বা সমন ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করার অপরাধে জরিমানা করা হলে জরিমানার অর্থ যদি পরিশোধ করা না হয় তাহলে গ্রাম আদালত তথ্য উল্লেখ করে একটি আদেশ লিখবেন এবং তা সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের নিকট পাঠাবেন। চেয়ারম্যান তা গ্রহণ করে উক্ত অর্থ ইউনিয়ন পরিষদের বকেয়া কর হিসাবে আদায় করবেন। আদায়কৃত অর্থ ইউ,পি তহবিলে জমা হবে।

১০। যে সমস্ত ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত বিচার করতে পারবে নাঃ-

(ক) ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রেঃ-

অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পূর্বে অন্য কোন আদালত কর্তৃক কোন আদালত গ্রাহ্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকে।

(খ) দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রেঃ-

(১) যখন কোন অপ্রাপ্ত বয়স্কের স্বার্থ জড়িত থাকলে।

(২) বিবাদের পক্ষগণের মধ্যে বিদ্যমান কলহের ব্যাপারে কোন সালিশের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকলে।

(৩) মামলায় সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা কার্যরত কোন সরকারী কর্মচারী পক্ষ হয়ে থাকলে।

উত্তরঃ- বৃটিশদের আগমণের পূর্বে এদেশে পঞ্চায়েত নামে যে সংস্থা প্রচলিত ছিল তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল বিচার কার্য সম্পাদন ও ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করা। বৃটিশরা যদিও প্রথমে এ দায়িত্ব স্থানীয় সংস্থার উপর অর্পণ করেনি কিন্তু বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগেই ১৯১৯ সালের পল্লী স্বায়ত্ব শাসন আইনের মাধ্যমে ইউনিয়ন বোর্ডকে দেওয়ানী ও ফৌজদারী উভয় প্রকার মামলার বিচার করার এখতিয়ার দেয়া হয়। আমাদের দেশের দরিদ্র জনসাধারণের অধিকাংশই গ্রামে বাস করে। এ দরিদ্র জনসাধারণের পক্ষে শহরে গিয়ে দীর্ঘ দিন মামলা-মোকর্দ্দমা চালানো অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার; সুতরাং গ্রাম পর্যায়ে যদি ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা ও মামলা মোকর্দ্দমা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকে তাহলে তারা অনেক বিড়ম্বনা ও খরচের হাত থেকে অব্যাহতি লাভ করতে পারে। দ্রুত বিচার কার্যের ফলে ঝগড়া-বিবাদের তীব্রতা ও ব্যাপকতা বহুলাংশে কমে যায় এবং তা গ্রামের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর প্রথম কয়েক বছর যদিও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় বিচার কার্য করার কোন ক্ষমতা ছিল না; কিন্তু গ্রাম আদালত অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ এবং পরবর্তীতে ২০০৬ সালের গেজেট এর মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে পুনরায় বিচার কার্য সম্পাদনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিচার নিষ্পত্তিমূলক ও সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যেই এ আদালত প্রবর্তন করা হয়েছে।

২। গ্রাম আদালতের গঠনঃ-

একজন চেয়ারম্যান এবং বিবাদের প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত দু'জন সদস্য নিয়ে মোট ৫ জন সদস্যের সমন্বয়ে গ্রাম আদালত গঠিত হয়। প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত দু'জন সদস্যের একজন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হবেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান হবেন। তবে প্রকাশ থাকে যে, অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, গ্রাম আদালতে দায়েরকৃত কোন মামলা পরিচালনার জন্য কোন পক্ষ কোন আইনজীবি নিয়োগ/মনোনীত করিতে পারিবেন না।

তবে যদি চেয়ারম্যান কোন কারণ বশতঃ তাঁর দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হন, কিংবা তাঁর নিরপেক্ষতা সম্পর্কে আপত্তি ওঠে তাহলে পরিষদের অন্য কোন সদস্য আদালতের চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করবেন। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন পক্ষ সদস্য মনোনয়ন দিতে ব্যর্থ হন তবে উক্ত মনোনয়ন ছাড়াই আদালত বৈধভাবে গঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে। যদি কোন পক্ষ ইউনিয়ন পরিষদের কোন সদস্যকে পক্ষপাতিত্বের কারণে মনোনীত করতে না পারেন তাহলে চেয়ারম্যানের অনুমতিক্রমে অন্য কোন ব্যক্তিকে মনোনীত করা যাবে।

৩। গ্রাম আদালতের এখতিয়ারঃ-

(ক) যে ইউনিয়নে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বা যেখানে অপরাধের কারণের উদ্ভব হয়েছে সে ইউনিয়নের ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে গ্রাম আদালত সীমাবদ্ধ থাকবে।

(খ) যখন কোন অপরাধ এক ইউনিয়নে সংঘটিত হয়েছে কিন্তু অপরাধীগণ অন্য ইউনিয়নের বাসিন্দা তখন যে ইউনিয়নে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সে ইউনিয়নে গ্রাম আদালত গঠিত হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয় তাদের স্ব-স্ব ইউনিয়ন হতে সদস্য মনোনয়ন দিতে পারবেন।

৪। গ্রাম আদালতের ক্ষমতাঃ-

(ক) গ্রাম আদালত অবমাননা বা সমন অস্বীকার করা ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে জরিমানা বা জরিমানা অনাদায়ে জেল প্রদান করতে পারবে না। কিন্তু বিচারযোগ্য ফৌজদারী অপরাধ সমূহের বিচারে কেউ যদি দোষী সাব্যস্ত হন তবে আদালত দোষী ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দানের আদেশ দিতে পারেন। কিন্তু ক্ষতিপূরণ কোন ভাবেই ২৫,০০০/- (পঁচিশ হাজার) টাকার উর্দ্ধে হবে না।

(খ) দেওয়ানী মামলার গ্রাম আদালত কোন ব্যক্তির প্রাপ্য টাকা পরিশোধ অথবা সম্পত্তির প্রকৃত মালিককে সম্পত্তি বা তার দখল প্রত্যার্পণ করার আদেশ দিতে পারেন।

৫। গ্রাম আদালতের কার্যপদ্ধতিঃ- 

গ্রাম আদালত কর্তৃক বিচারযোগ্য মামলার ক্ষেত্রে বিবাদের যে কোন পক্ষ বিচার চেয়ে গ্রাম আদালত গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট ৪.০০(চার) টাকা (দেওয়ানী মামলা হলে) অথবা ২.০০(দুই) টাকা (ফৌজদারী মামলা হলে) ফি দিয়ে আবেদন করতে পারেন। আবেদন পত্রে নিম্ন লিখিত বিবরণাদি থাকতে হবেঃ-

(ক) যে ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করা হচ্ছে তার নাম;

(খ) আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়;

(গ) বিবাদীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়;

(ঘ) যে ইউনিয়নে অপরাধ ঘটেছে অথবা মামলার কারণের সৃষ্টি হয়েছে তার নাম;

(ঙ) সংক্ষিপ্ত বিবরণাদিসহ অভিযোগ বা দাবীর প্রকৃতি ও পরিমাণ;

(চ) প্রার্থীত প্রতিকার;

(ছ) আবেদনকারী লিখিত আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করবেন।

উল্লেখ্য যে, কোন অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন আবেদন করা যাবে না। চেয়ারম্যান অভিযোগ অমূলক মনে করলে আবেদন নাকচ করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে নাকচের কারণ লিখে আবেদনপত্র আবেদনকারীকে ফেরত দিতে হবে।

নাকচের আদেশ অসৎ উদ্দেশ্য দেয়া হয়েছে বা মূলত অন্যায় করা হয়েছে এ কারণ দেখিয়ে বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি আবেদন অগ্রাহ্য করার তারিখ হতে ৩০(ত্রিশ) দিনের মধ্যে পুনঃ বিবেচনার জন্য যথাযথ এখতিয়ার সম্পন্ন সহকারী জজের (মুন্সেফ) নিকট আবেদন করতে পারেন। সহকারী জজ (মুন্সেফ) যদি মনে করেন যে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান যে আদেশ দিয়েছেন তা অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত বা যথার্থই অন্যায় তাহলে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে আবেদনপত্র গ্রহণ করার জন্য লিখিত নির্দেশ দিয়ে আবেদনকারীকে তা ফেরত দিবেন। 

আবেদনপত্র গৃহীত হলে ১ নং ফরমে রক্ষিত রেজিষ্টার বহিতে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে। রেজিষ্ট্রী করার পর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তারিখ ও সময় নির্দিষ্ট করে আবেদনকারীকে উপস্থিত হতে নির্দেশ দিবেন এবং বিবাদীকেও অনুরূপ নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় হাজির হবার জন্য সমন দিবেন। যে ব্যক্তিকে সমন দেয়া হবে, সে ব্যক্তির নিকট তা পাঠিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সমন জারী করতে হবে। সমনের অন্য প্রস্তের উল্টো পৃষ্ঠায় সমন প্রাপক প্রাপ্তি সূচক স্বাক্ষর দান করবেন। যদি সমন ব্যক্তিগতভাবে জারী করা সম্ভব না হয় তাহলে সমন জারী কারক কর্মচারী সমনের এক প্রস্ত বিবাদীর বসত বাড়ীর কোন প্রকাশ্য স্থানে লটকিয়ে দিবেন এবং এতদ্বারা সমন যথাযথভাবে জারী করা হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার বাইরে বসবাসরত ব্যক্তিকে রেজিষ্ট্রী ডাকযোগে (প্রাপ্তি বিচারপত্র সহ) সমন পাঠাতে হবে। বিবাদীর নিকট ২ নং ফরমে সমন পাঠাতে হবে। সমন জারীর জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, তা বাদীকে বহন করতে হবে। সমন জারী করার ৭(সাত) দিনের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পক্ষদ্বয়কে তাদের সদস্য মনোনীত করতে বলবেন এবং তাদের মনোনীত সদস্য নিয়ে চেয়ার‌ম্যান গ্রাম আদালত গঠন করবেন। গ্রাম আদালত গঠিত হবার পর চেয়ারম্যান বিবাদীকে ৩(তিন) দিনের মধ্যে আবেদনের বিরুদ্ধে তার লিখিত আপত্তি দাখিল করার জন্য নির্দেশ দিবেন। গ্রাম আদালতের অধিবেশনের তারিখ ও সময় নির্ধারিত করে পক্ষদ্বয়কে নিজ নিজ মামলার সমর্থনে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষী আনয়ন করার জন্য চেয়ারম্যান নির্দেশ দিবেন। চেয়ারম্যান নির্ধারিত তারিখে মামলার বিচার করবেন। গ্রাম আদালত সময়ে সময়ে শুনানী মূলতবী রাখতে পারে। কিন্তু মূলতবীর মেয়াদ কোনভাবেই ৭(সাত) দিনের বেশী হবে না। চেয়ারম্যান স্বাক্ষীকে শপথ করিয়ে তার বক্তব্য রাখার জন্য বলবেন এবং তার বক্তব্যের সারমর্ম লিপিবদ্ধ করবেন বা করাবেন। বিচারে যে কোন পর্যায়ে গ্রাম আদালত স্থানীয়ভাবে তদন্ত করতে পারেন।

যদি আবেদনকারী নির্ধারিত তারিখে হাজির হতে ব্যর্থ হন এবং চেয়ারম্যান যদি মনে করেন আবেদনকারী মামলা পরিচালনায় অবহেলা করছেন তাহলে তিনি আবেদন নাকচ করতে পারেন। নাকচ হবার ১০(দশ) দিনের মধ্যে আবেদনকারী পূর্নবহালের জন্য লিখিতভাবে চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন করলে চেয়ারম্যান আবেদনটি পূর্নবহাল করে মামলার তারিখ নির্দিষ্ট করবেন।

অনুরূপভাবে বিবাদীর অবহেলাজনিত অনুপস্থিতির কারণে তার অনুপস্থিতিতেই চেয়ারম্যান মামলার শুনানী ও নিষ্পত্তি করবেন। এক্ষেত্রে ১০(দশ) দিনের মধ্যে বিবাদী চেয়ারম্যানের নিকট লিখিতভাবে প্রতিকারের জন্য আবেদন করবেন। অনুপস্থিতির কারণ সন্তোষজনক বলে প্রতীয়মাণ হলে চেয়ারম্যান মামলাটি পূর্নবহাল করে পূনঃ শুনানীর জন্য তারিখ ধার্য করবেন।

৬। গ্রাম আদালতের সিদ্ধান্তঃ-

গ্রাম আদালতের রায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে, যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারা সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে, তার অনুপাত রায়ে অবশ্যই উল্লেখ থাকবে। রায়ের পর ৪ নং ফরমে একটি ডিক্রী প্রস্তুত করতে হবে।

গ্রাম আদালতে সিদ্ধান্ত যদি সর্বসম্মত বা চার এক ভোটে গৃহীত হয় তাহলে উক্ত সিদ্ধান্ত পক্ষদ্বয়ের উপর বাধ্যতামূলক হবে এবং সেক্ষেত্রে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনরূপ আপীল চলবে না।

যদি তিন-দুই এ কোন সিদ্ধান্ত হয় তবে সে সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক হবে না। সিদ্ধান্ত ঘোষণার ৩০(ত্রিশ) দিনের মধ্যে যে কোন পক্ষ ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিষ্ট্রেট (কগনিজেন্স আদালত) এবং দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রে সহকারী জজ (মুন্সেফ) এর আদালতে আপীল করতে পারবেন।

গ্রাম আদালত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডিক্রী বা ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানের নির্দেশ দিবেন তবে তা ৬(ছয়) মাসের অধিক হবে না।

৭। গ্রাম আদালতের আদেশ (ডিক্রী) বলবৎকরণঃ-

চেয়ারম্যান ৫ নং ফরমে ডিক্রী রেজিষ্টারে ডিক্রী লিপিবদ্ধ করবেন। গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য ডিক্রী দেবার পর নির্ধারিত তারিখের মধ্যে ডিক্রী বাবদ অর্থ জমা না দিলে গ্রাম আদালত ডিক্রীটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এর নিকট প্রেরণ করবেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বকেয়া কর আদায়ের পদ্ধতি অনুসরণ করে ডিক্রীর অর্থ আদায় করে ডিক্রীদারকে প্রদান করবেন।

কিন্তু উল্লেখ্য যে, আর্থিক ক্ষতিপূরণ ছাড়া অন্য কোন কিছু ক্ষতিপূরণ হিসাবে প্রদানের জন্য গ্রাম আদালত ডিক্রী প্রদান করলে, গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান ডিক্রীটি এখতিয়ার সম্পন্ন সহকারী জজ (মুন্সেফ) এর নিকট কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করবেন। সহকারী জজ (মুন্সেফ) উক্ত ডিক্রী কার্যকরীর বিষয়ে এমণভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন যেন তার আদালতই ডিক্রীটি প্রদান করেছেন।

৮। গ্রাম আদালতের জরিমানাঃ-

আইন সঙ্গত কারণ ছাড়া নিম্নলিখিত অপরাধের জন্য কোন ব্যক্তি গ্রাম আদালত অবমাননার দোষে দোষী হতে পারেনঃ-

(ক) আদালত চলাকালীন আদালতকে বা তার কোন সদস্যকে কাজ চলাকালে অপমান করা।

(খ) আদালতের কোন কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা।

(গ) আদালতের কোন বৈধ প্রশ্নের উত্তর দানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন।

(ঘ) আদালতের আদেশ সত্ত্বেও কোন দলিল দাখিল বা অর্পণ করতে ব্যর্থ হওয়া।

(ঙ) সত্য কথা বলার জন্য শপৎ নিতে অস্বীকার বা আদালতের নির্দেশানুসারে প্রদত্ত জবানবন্দীতে দস্তখত করতে অস্বীকার করা।

উল্লিখিত যে কোন একটি অপরাধের জন্য গ্রাম আদালত সংশ্লিষ্ট অপরাধীকে তার কৃত অপরাধের জন্য ৫০০/- (পাঁচশত) টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন। বিচারের স্বার্থে গ্রাম আদালতে যে কোন ব্যক্তিকে হাজির হতে/সাক্ষ্য দিতে/দলিল দাখিল করতে সমন দিতে পারে। আইন সঙ্গত অজুহাত ব্যতিরেকে সমন প্রাপ্ত ব্যক্তি আদালতে হাজির হতে বা রাষ্ট্রীয় গোপনীয় নয় এমন দলিলাদি দাখিল করতে ব্যর্থ হলে তাকে বক্তব্য পেশের সুযোগ দেবার পর সংশ্লিষ্ট আদালত উক্ত ব্যক্তিকে অনধিক ২৫০/- (দুইশত পঞ্চাশ) টাকা জরিমানা করতে পারেন।

৯। জরিমানা আদায়ঃ-

আদালত অবমাননা বা সমন ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করার অপরাধে জরিমানা করা হলে জরিমানার অর্থ যদি পরিশোধ করা না হয় তাহলে গ্রাম আদালত তথ্য উল্লেখ করে একটি আদেশ লিখবেন এবং তা সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের নিকট পাঠাবেন। চেয়ারম্যান তা গ্রহণ করে উক্ত অর্থ ইউনিয়ন পরিষদের বকেয়া কর হিসাবে আদায় করবেন। আদায়কৃত অর্থ ইউ,পি তহবিলে জমা হবে।

১০। যে সমস্ত ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত বিচার করতে পারবে নাঃ-

(ক) ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রেঃ-

অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পূর্বে অন্য কোন আদালত কর্তৃক কোন আদালত গ্রাহ্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকে।

(খ) দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রেঃ-

(১) যখন কোন অপ্রাপ্ত বয়স্কের স্বার্থ জড়িত থাকলে।

(২) বিবাদের পক্ষগণের মধ্যে বিদ্যমান কলহের ব্যাপারে কোন সালিশের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকলে।

(৩) মামলায় সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা কার্যরত কোন সরকারী কর্মচারী পক্ষ হয়ে থাকলে।

উত্তরঃ- বৃটিশদের আগমণের পূর্বে এদেশে পঞ্চায়েত নামে যে সংস্থা প্রচলিত ছিল তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল বিচার কার্য সম্পাদন ও ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করা। বৃটিশরা যদিও প্রথমে এ দায়িত্ব স্থানীয় সংস্থার উপর অর্পণ করেনি কিন্তু বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগেই ১৯১৯ সালের পল্লী স্বায়ত্ব শাসন আইনের মাধ্যমে ইউনিয়ন বোর্ডকে দেওয়ানী ও ফৌজদারী উভয় প্রকার মামলার বিচার করার এখতিয়ার দেয়া হয়। আমাদের দেশের দরিদ্র জনসাধারণের অধিকাংশই গ্রামে বাস করে। এ দরিদ্র জনসাধারণের পক্ষে শহরে গিয়ে দীর্ঘ দিন মামলা-মোকর্দ্দমা চালানো অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার; সুতরাং গ্রাম পর্যায়ে যদি ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা ও মামলা মোকর্দ্দমা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকে তাহলে তারা অনেক বিড়ম্বনা ও খরচের হাত থেকে অব্যাহতি লাভ করতে পারে। দ্রুত বিচার কার্যের ফলে ঝগড়া-বিবাদের তীব্রতা ও ব্যাপকতা বহুলাংশে কমে যায় এবং তা গ্রামের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর প্রথম কয়েক বছর যদিও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় বিচার কার্য করার কোন ক্ষমতা ছিল না; কিন্তু গ্রাম আদালত অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ এবং পরবর্তীতে ২০০৬ সালের গেজেট এর মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে পুনরায় বিচার কার্য সম্পাদনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিচার নিষ্পত্তিমূলক ও সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যেই এ আদালত প্রবর্তন করা হয়েছে।

২। গ্রাম আদালতের গঠনঃ-

একজন চেয়ারম্যান এবং বিবাদের প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত দু'জন সদস্য নিয়ে মোট ৫ জন সদস্যের সমন্বয়ে গ্রাম আদালত গঠিত হয়। প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত দু'জন সদস্যের একজন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হবেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান হবেন। তবে প্রকাশ থাকে যে, অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, গ্রাম আদালতে দায়েরকৃত কোন মামলা পরিচালনার জন্য কোন পক্ষ কোন আইনজীবি নিয়োগ/মনোনীত করিতে পারিবেন না।

তবে যদি চেয়ারম্যান কোন কারণ বশতঃ তাঁর দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হন, কিংবা তাঁর নিরপেক্ষতা সম্পর্কে আপত্তি ওঠে তাহলে পরিষদের অন্য কোন সদস্য আদালতের চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করবেন। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন পক্ষ সদস্য মনোনয়ন দিতে ব্যর্থ হন তবে উক্ত মনোনয়ন ছাড়াই আদালত বৈধভাবে গঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে। যদি কোন পক্ষ ইউনিয়ন পরিষদের কোন সদস্যকে পক্ষপাতিত্বের কারণে মনোনীত করতে না পারেন তাহলে চেয়ারম্যানের অনুমতিক্রমে অন্য কোন ব্যক্তিকে মনোনীত করা যাবে।

৩। গ্রাম আদালতের এখতিয়ারঃ-

(ক) যে ইউনিয়নে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বা যেখানে অপরাধের কারণের উদ্ভব হয়েছে সে ইউনিয়নের ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে গ্রাম আদালত সীমাবদ্ধ থাকবে।

(খ) যখন কোন অপরাধ এক ইউনিয়নে সংঘটিত হয়েছে কিন্তু অপরাধীগণ অন্য ইউনিয়নের বাসিন্দা তখন যে ইউনিয়নে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সে ইউনিয়নে গ্রাম আদালত গঠিত হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয় তাদের স্ব-স্ব ইউনিয়ন হতে সদস্য মনোনয়ন দিতে পারবেন।

৪। গ্রাম আদালতের ক্ষমতাঃ-

(ক) গ্রাম আদালত অবমাননা বা সমন অস্বীকার করা ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে জরিমানা বা জরিমানা অনাদায়ে জেল প্রদান করতে পারবে না। কিন্তু বিচারযোগ্য ফৌজদারী অপরাধ সমূহের বিচারে কেউ যদি দোষী সাব্যস্ত হন তবে আদালত দোষী ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দানের আদেশ দিতে পারেন। কিন্তু ক্ষতিপূরণ কোন ভাবেই ২৫,০০০/- (পঁচিশ হাজার) টাকার উর্দ্ধে হবে না।

(খ) দেওয়ানী মামলার গ্রাম আদালত কোন ব্যক্তির প্রাপ্য টাকা পরিশোধ অথবা সম্পত্তির প্রকৃত মালিককে সম্পত্তি বা তার দখল প্রত্যার্পণ করার আদেশ দিতে পারেন।

৫। গ্রাম আদালতের কার্যপদ্ধতিঃ- 

গ্রাম আদালত কর্তৃক বিচারযোগ্য মামলার ক্ষেত্রে বিবাদের যে কোন পক্ষ বিচার চেয়ে গ্রাম আদালত গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট ৪.০০(চার) টাকা (দেওয়ানী মামলা হলে) অথবা ২.০০(দুই) টাকা (ফৌজদারী মামলা হলে) ফি দিয়ে আবেদন করতে পারেন। আবেদন পত্রে নিম্ন লিখিত বিবরণাদি থাকতে হবেঃ-

(ক) যে ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করা হচ্ছে তার নাম;

(খ) আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়;

(গ) বিবাদীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়;

(ঘ) যে ইউনিয়নে অপরাধ ঘটেছে অথবা মামলার কারণের সৃষ্টি হয়েছে তার নাম;

(ঙ) সংক্ষিপ্ত বিবরণাদিসহ অভিযোগ বা দাবীর প্রকৃতি ও পরিমাণ;

(চ) প্রার্থীত প্রতিকার;

(ছ) আবেদনকারী লিখিত আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করবেন।

উল্লেখ্য যে, কোন অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন আবেদন করা যাবে না। চেয়ারম্যান অভিযোগ অমূলক মনে করলে আবেদন নাকচ করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে নাকচের কারণ লিখে আবেদনপত্র আবেদনকারীকে ফেরত দিতে হবে।

নাকচের আদেশ অসৎ উদ্দেশ্য দেয়া হয়েছে বা মূলত অন্যায় করা হয়েছে এ কারণ দেখিয়ে বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি আবেদন অগ্রাহ্য করার তারিখ হতে ৩০(ত্রিশ) দিনের মধ্যে পুনঃ বিবেচনার জন্য যথাযথ এখতিয়ার সম্পন্ন সহকারী জজের (মুন্সেফ) নিকট আবেদন করতে পারেন। সহকারী জজ (মুন্সেফ) যদি মনে করেন যে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান যে আদেশ দিয়েছেন তা অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত বা যথার্থই অন্যায় তাহলে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে আবেদনপত্র গ্রহণ করার জন্য লিখিত নির্দেশ দিয়ে আবেদনকারীকে তা ফেরত দিবেন। 

আবেদনপত্র গৃহীত হলে ১ নং ফরমে রক্ষিত রেজিষ্টার বহিতে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে। রেজিষ্ট্রী করার পর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তারিখ ও সময় নির্দিষ্ট করে আবেদনকারীকে উপস্থিত হতে নির্দেশ দিবেন এবং বিবাদীকেও অনুরূপ নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় হাজির হবার জন্য সমন দিবেন। যে ব্যক্তিকে সমন দেয়া হবে, সে ব্যক্তির নিকট তা পাঠিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সমন জারী করতে হবে। সমনের অন্য প্রস্তের উল্টো পৃষ্ঠায় সমন প্রাপক প্রাপ্তি সূচক স্বাক্ষর দান করবেন। যদি সমন ব্যক্তিগতভাবে জারী করা সম্ভব না হয় তাহলে সমন জারী কারক কর্মচারী সমনের এক প্রস্ত বিবাদীর বসত বাড়ীর কোন প্রকাশ্য স্থানে লটকিয়ে দিবেন এবং এতদ্বারা সমন যথাযথভাবে জারী করা হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার বাইরে বসবাসরত ব্যক্তিকে রেজিষ্ট্রী ডাকযোগে (প্রাপ্তি বিচারপত্র সহ) সমন পাঠাতে হবে। বিবাদীর নিকট ২ নং ফরমে সমন পাঠাতে হবে। সমন জারীর জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, তা বাদীকে বহন করতে হবে। সমন জারী করার ৭(সাত) দিনের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পক্ষদ্বয়কে তাদের সদস্য মনোনীত করতে বলবেন এবং তাদের মনোনীত সদস্য নিয়ে চেয়ার‌ম্যান গ্রাম আদালত গঠন করবেন। গ্রাম আদালত গঠিত হবার পর চেয়ারম্যান বিবাদীকে ৩(তিন) দিনের মধ্যে আবেদনের বিরুদ্ধে তার লিখিত আপত্তি দাখিল করার জন্য নির্দেশ দিবেন। গ্রাম আদালতের অধিবেশনের তারিখ ও সময় নির্ধারিত করে পক্ষদ্বয়কে নিজ নিজ মামলার সমর্থনে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষী আনয়ন করার জন্য চেয়ারম্যান নির্দেশ দিবেন। চেয়ারম্যান নির্ধারিত তারিখে মামলার বিচার করবেন। গ্রাম আদালত সময়ে সময়ে শুনানী মূলতবী রাখতে পারে। কিন্তু মূলতবীর মেয়াদ কোনভাবেই ৭(সাত) দিনের বেশী হবে না। চেয়ারম্যান স্বাক্ষীকে শপথ করিয়ে তার বক্তব্য রাখার জন্য বলবেন এবং তার বক্তব্যের সারমর্ম লিপিবদ্ধ করবেন বা করাবেন। বিচারে যে কোন পর্যায়ে গ্রাম আদালত স্থানীয়ভাবে তদন্ত করতে পারেন।

যদি আবেদনকারী নির্ধারিত তারিখে হাজির হতে ব্যর্থ হন এবং চেয়ারম্যান যদি মনে করেন আবেদনকারী মামলা পরিচালনায় অবহেলা করছেন তাহলে তিনি আবেদন নাকচ করতে পারেন। নাকচ হবার ১০(দশ) দিনের মধ্যে আবেদনকারী পূর্নবহালের জন্য লিখিতভাবে চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন করলে চেয়ারম্যান আবেদনটি পূর্নবহাল করে মামলার তারিখ নির্দিষ্ট করবেন।

অনুরূপভাবে বিবাদীর অবহেলাজনিত অনুপস্থিতির কারণে তার অনুপস্থিতিতেই চেয়ারম্যান মামলার শুনানী ও নিষ্পত্তি করবেন। এক্ষেত্রে ১০(দশ) দিনের মধ্যে বিবাদী চেয়ারম্যানের নিকট লিখিতভাবে প্রতিকারের জন্য আবেদন করবেন। অনুপস্থিতির কারণ সন্তোষজনক বলে প্রতীয়মাণ হলে চেয়ারম্যান মামলাটি পূর্নবহাল করে পূনঃ শুনানীর জন্য তারিখ ধার্য করবেন।

৬। গ্রাম আদালতের সিদ্ধান্তঃ-

গ্রাম আদালতের রায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে, যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারা সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে, তার অনুপাত রায়ে অবশ্যই উল্লেখ থাকবে। রায়ের পর ৪ নং ফরমে একটি ডিক্রী প্রস্তুত করতে হবে।

গ্রাম আদালতে সিদ্ধান্ত যদি সর্বসম্মত বা চার এক ভোটে গৃহীত হয় তাহলে উক্ত সিদ্ধান্ত পক্ষদ্বয়ের উপর বাধ্যতামূলক হবে এবং সেক্ষেত্রে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনরূপ আপীল চলবে না।

যদি তিন-দুই এ কোন সিদ্ধান্ত হয় তবে সে সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক হবে না। সিদ্ধান্ত ঘোষণার ৩০(ত্রিশ) দিনের মধ্যে যে কোন পক্ষ ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিষ্ট্রেট (কগনিজেন্স আদালত) এবং দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রে সহকারী জজ (মুন্সেফ) এর আদালতে আপীল করতে পারবেন।

গ্রাম আদালত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডিক্রী বা ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানের নির্দেশ দিবেন তবে তা ৬(ছয়) মাসের অধিক হবে না।

৭। গ্রাম আদালতের আদেশ (ডিক্রী) বলবৎকরণঃ-

চেয়ারম্যান ৫ নং ফরমে ডিক্রী রেজিষ্টারে ডিক্রী লিপিবদ্ধ করবেন। গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য ডিক্রী দেবার পর নির্ধারিত তারিখের মধ্যে ডিক্রী বাবদ অর্থ জমা না দিলে গ্রাম আদালত ডিক্রীটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এর নিকট প্রেরণ করবেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বকেয়া কর আদায়ের পদ্ধতি অনুসরণ করে ডিক্রীর অর্থ আদায় করে ডিক্রীদারকে প্রদান করবেন।

কিন্তু উল্লেখ্য যে, আর্থিক ক্ষতিপূরণ ছাড়া অন্য কোন কিছু ক্ষতিপূরণ হিসাবে প্রদানের জন্য গ্রাম আদালত ডিক্রী প্রদান করলে, গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান ডিক্রীটি এখতিয়ার সম্পন্ন সহকারী জজ (মুন্সেফ) এর নিকট কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করবেন। সহকারী জজ (মুন্সেফ) উক্ত ডিক্রী কার্যকরীর বিষয়ে এমণভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন যেন তার আদালতই ডিক্রীটি প্রদান করেছেন।

৮। গ্রাম আদালতের জরিমানাঃ-

আইন সঙ্গত কারণ ছাড়া নিম্নলিখিত অপরাধের জন্য কোন ব্যক্তি গ্রাম আদালত অবমাননার দোষে দোষী হতে পারেনঃ-

(ক) আদালত চলাকালীন আদালতকে বা তার কোন সদস্যকে কাজ চলাকালে অপমান করা।

(খ) আদালতের কোন কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা।

(গ) আদালতের কোন বৈধ প্রশ্নের উত্তর দানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন।

(ঘ) আদালতের আদেশ সত্ত্বেও কোন দলিল দাখিল বা অর্পণ করতে ব্যর্থ হওয়া।

(ঙ) সত্য কথা বলার জন্য শপৎ নিতে অস্বীকার বা আদালতের নির্দেশানুসারে প্রদত্ত জবানবন্দীতে দস্তখত করতে অস্বীকার করা।

উল্লিখিত যে কোন একটি অপরাধের জন্য গ্রাম আদালত সংশ্লিষ্ট অপরাধীকে তার কৃত অপরাধের জন্য ৫০০/- (পাঁচশত) টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন। বিচারের স্বার্থে গ্রাম আদালতে যে কোন ব্যক্তিকে হাজির হতে/সাক্ষ্য দিতে/দলিল দাখিল করতে সমন দিতে পারে। আইন সঙ্গত অজুহাত ব্যতিরেকে সমন প্রাপ্ত ব্যক্তি আদালতে হাজির হতে বা রাষ্ট্রীয় গোপনীয় নয় এমন দলিলাদি দাখিল করতে ব্যর্থ হলে তাকে বক্তব্য পেশের সুযোগ দেবার পর সংশ্লিষ্ট আদালত উক্ত ব্যক্তিকে অনধিক ২৫০/- (দুইশত পঞ্চাশ) টাকা জরিমানা করতে পারেন।

৯। জরিমানা আদায়ঃ-

আদালত অবমাননা বা সমন ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করার অপরাধে জরিমানা করা হলে জরিমানার অর্থ যদি পরিশোধ করা না হয় তাহলে গ্রাম আদালত তথ্য উল্লেখ করে একটি আদেশ লিখবেন এবং তা সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের নিকট পাঠাবেন। চেয়ারম্যান তা গ্রহণ করে উক্ত অর্থ ইউনিয়ন পরিষদের বকেয়া কর হিসাবে আদায় করবেন। আদায়কৃত অর্থ ইউ,পি তহবিলে জমা হবে।

১০। যে সমস্ত ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত বিচার করতে পারবে নাঃ-

(ক) ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রেঃ-

অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পূর্বে অন্য কোন আদালত কর্তৃক কোন আদালত গ্রাহ্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকে।

(খ) দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রেঃ-

(১) যখন কোন অপ্রাপ্ত বয়স্কের স্বার্থ জড়িত থাকলে।

(২) বিবাদের পক্ষগণের মধ্যে বিদ্যমান কলহের ব্যাপারে কোন সালিশের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকলে।

(৩) মামলায় সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা কার্যরত কোন সরকারী কর্মচারী পক্ষ হয়ে থাকলে।

উত্তরঃ- বৃটিশদের আগমণের পূর্বে এদেশে পঞ্চায়েত নামে যে সংস্থা প্রচলিত ছিল তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল বিচার কার্য সম্পাদন ও ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করা। বৃটিশরা যদিও প্রথমে এ দায়িত্ব স্থানীয় সংস্থার উপর অর্পণ করেনি কিন্তু বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগেই ১৯১৯ সালের পল্লী স্বায়ত্ব শাসন আইনের মাধ্যমে ইউনিয়ন বোর্ডকে দেওয়ানী ও ফৌজদারী উভয় প্রকার মামলার বিচার করার এখতিয়ার দেয়া হয়। আমাদের দেশের দরিদ্র জনসাধারণের অধিকাংশই গ্রামে বাস করে। এ দরিদ্র জনসাধারণের পক্ষে শহরে গিয়ে দীর্ঘ দিন মামলা-মোকর্দ্দমা চালানো অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার; সুতরাং গ্রাম পর্যায়ে যদি ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা ও মামলা মোকর্দ্দমা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকে তাহলে তারা অনেক বিড়ম্বনা ও খরচের হাত থেকে অব্যাহতি লাভ করতে পারে। দ্রুত বিচার কার্যের ফলে ঝগড়া-বিবাদের তীব্রতা ও ব্যাপকতা বহুলাংশে কমে যায় এবং তা গ্রামের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর প্রথম কয়েক বছর যদিও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় বিচার কার্য করার কোন ক্ষমতা ছিল না; কিন্তু গ্রাম আদালত অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ এবং পরবর্তীতে ২০০৬ সালের গেজেট এর মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে পুনরায় বিচার কার্য সম্পাদনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিচার নিষ্পত্তিমূলক ও সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যেই এ আদালত প্রবর্তন করা হয়েছে।

২। গ্রাম আদালতের গঠনঃ-

একজন চেয়ারম্যান এবং বিবাদের প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত দু'জন সদস্য নিয়ে মোট ৫ জন সদস্যের সমন্বয়ে গ্রাম আদালত গঠিত হয়। প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত দু'জন সদস্যের একজন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হবেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান হবেন। তবে প্রকাশ থাকে যে, অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, গ্রাম আদালতে দায়েরকৃত কোন মামলা পরিচালনার জন্য কোন পক্ষ কোন আইনজীবি নিয়োগ/মনোনীত করিতে পারিবেন না।

তবে যদি চেয়ারম্যান কোন কারণ বশতঃ তাঁর দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হন, কিংবা তাঁর নিরপেক্ষতা সম্পর্কে আপত্তি ওঠে তাহলে পরিষদের অন্য কোন সদস্য আদালতের চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করবেন। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন পক্ষ সদস্য মনোনয়ন দিতে ব্যর্থ হন তবে উক্ত মনোনয়ন ছাড়াই আদালত বৈধভাবে গঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে। যদি কোন পক্ষ ইউনিয়ন পরিষদের কোন সদস্যকে পক্ষপাতিত্বের কারণে মনোনীত করতে না পারেন তাহলে চেয়ারম্যানের অনুমতিক্রমে অন্য কোন ব্যক্তিকে মনোনীত করা যাবে।

৩। গ্রাম আদালতের এখতিয়ারঃ-

(ক) যে ইউনিয়নে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বা যেখানে অপরাধের কারণের উদ্ভব হয়েছে সে ইউনিয়নের ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে গ্রাম আদালত সীমাবদ্ধ থাকবে।

(খ) যখন কোন অপরাধ এক ইউনিয়নে সংঘটিত হয়েছে কিন্তু অপরাধীগণ অন্য ইউনিয়নের বাসিন্দা তখন যে ইউনিয়নে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সে ইউনিয়নে গ্রাম আদালত গঠিত হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয় তাদের স্ব-স্ব ইউনিয়ন হতে সদস্য মনোনয়ন দিতে পারবেন।

৪। গ্রাম আদালতের ক্ষমতাঃ-

(ক) গ্রাম আদালত অবমাননা বা সমন অস্বীকার করা ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে জরিমানা বা জরিমানা অনাদায়ে জেল প্রদান করতে পারবে না। কিন্তু বিচারযোগ্য ফৌজদারী অপরাধ সমূহের বিচারে কেউ যদি দোষী সাব্যস্ত হন তবে আদালত দোষী ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দানের আদেশ দিতে পারেন। কিন্তু ক্ষতিপূরণ কোন ভাবেই ২৫,০০০/- (পঁচিশ হাজার) টাকার উর্দ্ধে হবে না।

(খ) দেওয়ানী মামলার গ্রাম আদালত কোন ব্যক্তির প্রাপ্য টাকা পরিশোধ অথবা সম্পত্তির প্রকৃত মালিককে সম্পত্তি বা তার দখল প্রত্যার্পণ করার আদেশ দিতে পারেন।

৫। গ্রাম আদালতের কার্যপদ্ধতিঃ- 

গ্রাম আদালত কর্তৃক বিচারযোগ্য মামলার ক্ষেত্রে বিবাদের যে কোন পক্ষ বিচার চেয়ে গ্রাম আদালত গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট ৪.০০(চার) টাকা (দেওয়ানী মামলা হলে) অথবা ২.০০(দুই) টাকা (ফৌজদারী মামলা হলে) ফি দিয়ে আবেদন করতে পারেন। আবেদন পত্রে নিম্ন লিখিত বিবরণাদি থাকতে হবেঃ-

(ক) যে ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করা হচ্ছে তার নাম;

(খ) আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়;

(গ) বিবাদীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়;

(ঘ) যে ইউনিয়নে অপরাধ ঘটেছে অথবা মামলার কারণের সৃষ্টি হয়েছে তার নাম;

(ঙ) সংক্ষিপ্ত বিবরণাদিসহ অভিযোগ বা দাবীর প্রকৃতি ও পরিমাণ;

(চ) প্রার্থীত প্রতিকার;

(ছ) আবেদনকারী লিখিত আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করবেন।

উল্লেখ্য যে, কোন অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন আবেদন করা যাবে না। চেয়ারম্যান অভিযোগ অমূলক মনে করলে আবেদন নাকচ করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে নাকচের কারণ লিখে আবেদনপত্র আবেদনকারীকে ফেরত দিতে হবে।

নাকচের আদেশ অসৎ উদ্দেশ্য দেয়া হয়েছে বা মূলত অন্যায় করা হয়েছে এ কারণ দেখিয়ে বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি আবেদন অগ্রাহ্য করার তারিখ হতে ৩০(ত্রিশ) দিনের মধ্যে পুনঃ বিবেচনার জন্য যথাযথ এখতিয়ার সম্পন্ন সহকারী জজের (মুন্সেফ) নিকট আবেদন করতে পারেন। সহকারী জজ (মুন্সেফ) যদি মনে করেন যে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান যে আদেশ দিয়েছেন তা অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত বা যথার্থই অন্যায় তাহলে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে আবেদনপত্র গ্রহণ করার জন্য লিখিত নির্দেশ দিয়ে আবেদনকারীকে তা ফেরত দিবেন। 

আবেদনপত্র গৃহীত হলে ১ নং ফরমে রক্ষিত রেজিষ্টার বহিতে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে। রেজিষ্ট্রী করার পর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তারিখ ও সময় নির্দিষ্ট করে আবেদনকারীকে উপস্থিত হতে নির্দেশ দিবেন এবং বিবাদীকেও অনুরূপ নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় হাজির হবার জন্য সমন দিবেন। যে ব্যক্তিকে সমন দেয়া হবে, সে ব্যক্তির নিকট তা পাঠিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সমন জারী করতে হবে। সমনের অন্য প্রস্তের উল্টো পৃষ্ঠায় সমন প্রাপক প্রাপ্তি সূচক স্বাক্ষর দান করবেন। যদি সমন ব্যক্তিগতভাবে জারী করা সম্ভব না হয় তাহলে সমন জারী কারক কর্মচারী সমনের এক প্রস্ত বিবাদীর বসত বাড়ীর কোন প্রকাশ্য স্থানে লটকিয়ে দিবেন এবং এতদ্বারা সমন যথাযথভাবে জারী করা হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার বাইরে বসবাসরত ব্যক্তিকে রেজিষ্ট্রী ডাকযোগে (প্রাপ্তি বিচারপত্র সহ) সমন পাঠাতে হবে। বিবাদীর নিকট ২ নং ফরমে সমন পাঠাতে হবে। সমন জারীর জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, তা বাদীকে বহন করতে হবে। সমন জারী করার ৭(সাত) দিনের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পক্ষদ্বয়কে তাদের সদস্য মনোনীত করতে বলবেন এবং তাদের মনোনীত সদস্য নিয়ে চেয়ার‌ম্যান গ্রাম আদালত গঠন করবেন। গ্রাম আদালত গঠিত হবার পর চেয়ারম্যান বিবাদীকে ৩(তিন) দিনের মধ্যে আবেদনের বিরুদ্ধে তার লিখিত আপত্তি দাখিল করার জন্য নির্দেশ দিবেন। গ্রাম আদালতের অধিবেশনের তারিখ ও সময় নির্ধারিত করে পক্ষদ্বয়কে নিজ নিজ মামলার সমর্থনে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষী আনয়ন করার জন্য চেয়ারম্যান নির্দেশ দিবেন। চেয়ারম্যান নির্ধারিত তারিখে মামলার বিচার করবেন। গ্রাম আদালত সময়ে সময়ে শুনানী মূলতবী রাখতে পারে। কিন্তু মূলতবীর মেয়াদ কোনভাবেই ৭(সাত) দিনের বেশী হবে না। চেয়ারম্যান স্বাক্ষীকে শপথ করিয়ে তার বক্তব্য রাখার জন্য বলবেন এবং তার বক্তব্যের সারমর্ম লিপিবদ্ধ করবেন বা করাবেন। বিচারে যে কোন পর্যায়ে গ্রাম আদালত স্থানীয়ভাবে তদন্ত করতে পারেন।

যদি আবেদনকারী নির্ধারিত তারিখে হাজির হতে ব্যর্থ হন এবং চেয়ারম্যান যদি মনে করেন আবেদনকারী মামলা পরিচালনায় অবহেলা করছেন তাহলে তিনি আবেদন নাকচ করতে পারেন। নাকচ হবার ১০(দশ) দিনের মধ্যে আবেদনকারী পূর্নবহালের জন্য লিখিতভাবে চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন করলে চেয়ারম্যান আবেদনটি পূর্নবহাল করে মামলার তারিখ নির্দিষ্ট করবেন।

অনুরূপভাবে বিবাদীর অবহেলাজনিত অনুপস্থিতির কারণে তার অনুপস্থিতিতেই চেয়ারম্যান মামলার শুনানী ও নিষ্পত্তি করবেন। এক্ষেত্রে ১০(দশ) দিনের মধ্যে বিবাদী চেয়ারম্যানের নিকট লিখিতভাবে প্রতিকারের জন্য আবেদন করবেন। অনুপস্থিতির কারণ সন্তোষজনক বলে প্রতীয়মাণ হলে চেয়ারম্যান মামলাটি পূর্নবহাল করে পূনঃ শুনানীর জন্য তারিখ ধার্য করবেন।

৬। গ্রাম আদালতের সিদ্ধান্তঃ-

গ্রাম আদালতের রায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে, যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারা সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে, তার অনুপাত রায়ে অবশ্যই উল্লেখ থাকবে। রায়ের পর ৪ নং ফরমে একটি ডিক্রী প্রস্তুত করতে হবে।

গ্রাম আদালতে সিদ্ধান্ত যদি সর্বসম্মত বা চার এক ভোটে গৃহীত হয় তাহলে উক্ত সিদ্ধান্ত পক্ষদ্বয়ের উপর বাধ্যতামূলক হবে এবং সেক্ষেত্রে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনরূপ আপীল চলবে না।

যদি তিন-দুই এ কোন সিদ্ধান্ত হয় তবে সে সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক হবে না। সিদ্ধান্ত ঘোষণার ৩০(ত্রিশ) দিনের মধ্যে যে কোন পক্ষ ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিষ্ট্রেট (কগনিজেন্স আদালত) এবং দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রে সহকারী জজ (মুন্সেফ) এর আদালতে আপীল করতে পারবেন।

গ্রাম আদালত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডিক্রী বা ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানের নির্দেশ দিবেন তবে তা ৬(ছয়) মাসের অধিক হবে না।

৭। গ্রাম আদালতের আদেশ (ডিক্রী) বলবৎকরণঃ-

চেয়ারম্যান ৫ নং ফরমে ডিক্রী রেজিষ্টারে ডিক্রী লিপিবদ্ধ করবেন। গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য ডিক্রী দেবার পর নির্ধারিত তারিখের মধ্যে ডিক্রী বাবদ অর্থ জমা না দিলে গ্রাম আদালত ডিক্রীটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এর নিকট প্রেরণ করবেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বকেয়া কর আদায়ের পদ্ধতি অনুসরণ করে ডিক্রীর অর্থ আদায় করে ডিক্রীদারকে প্রদান করবেন।

কিন্তু উল্লেখ্য যে, আর্থিক ক্ষতিপূরণ ছাড়া অন্য কোন কিছু ক্ষতিপূরণ হিসাবে প্রদানের জন্য গ্রাম আদালত ডিক্রী প্রদান করলে, গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান ডিক্রীটি এখতিয়ার সম্পন্ন সহকারী জজ (মুন্সেফ) এর নিকট কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করবেন। সহকারী জজ (মুন্সেফ) উক্ত ডিক্রী কার্যকরীর বিষয়ে এমণভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন যেন তার আদালতই ডিক্রীটি প্রদান করেছেন।

৮। গ্রাম আদালতের জরিমানাঃ-

আইন সঙ্গত কারণ ছাড়া নিম্নলিখিত অপরাধের জন্য কোন ব্যক্তি গ্রাম আদালত অবমাননার দোষে দোষী হতে পারেনঃ-

(ক) আদালত চলাকালীন আদালতকে বা তার কোন সদস্যকে কাজ চলাকালে অপমান করা।

(খ) আদালতের কোন কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা।

(গ) আদালতের কোন বৈধ প্রশ্নের উত্তর দানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন।

(ঘ) আদালতের আদেশ সত্ত্বেও কোন দলিল দাখিল বা অর্পণ করতে ব্যর্থ হওয়া।

(ঙ) সত্য কথা বলার জন্য শপৎ নিতে অস্বীকার বা আদালতের নির্দেশানুসারে প্রদত্ত জবানবন্দীতে দস্তখত করতে অস্বীকার করা।

উল্লিখিত যে কোন একটি অপরাধের জন্য গ্রাম আদালত সংশ্লিষ্ট অপরাধীকে তার কৃত অপরাধের জন্য ৫০০/- (পাঁচশত) টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন। বিচারের স্বার্থে গ্রাম আদালতে যে কোন ব্যক্তিকে হাজির হতে/সাক্ষ্য দিতে/দলিল দাখিল করতে সমন দিতে পারে। আইন সঙ্গত অজুহাত ব্যতিরেকে সমন প্রাপ্ত ব্যক্তি আদালতে হাজির হতে বা রাষ্ট্রীয় গোপনীয় নয় এমন দলিলাদি দাখিল করতে ব্যর্থ হলে তাকে বক্তব্য পেশের সুযোগ দেবার পর সংশ্লিষ্ট আদালত উক্ত ব্যক্তিকে অনধিক ২৫০/- (দুইশত পঞ্চাশ) টাকা জরিমানা করতে পারেন।

৯। জরিমানা আদায়ঃ-

আদালত অবমাননা বা সমন ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করার অপরাধে জরিমানা করা হলে জরিমানার অর্থ যদি পরিশোধ করা না হয় তাহলে গ্রাম আদালত তথ্য উল্লেখ করে একটি আদেশ লিখবেন এবং তা সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের নিকট পাঠাবেন। চেয়ারম্যান তা গ্রহণ করে উক্ত অর্থ ইউনিয়ন পরিষদের বকেয়া কর হিসাবে আদায় করবেন। আদায়কৃত অর্থ ইউ,পি তহবিলে জমা হবে।

১০। যে সমস্ত ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত বিচার করতে পারবে নাঃ-

(ক) ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রেঃ-

অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পূর্বে অন্য কোন আদালত কর্তৃক কোন আদালত গ্রাহ্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকে।

(খ) দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রেঃ-

(১) যখন কোন অপ্রাপ্ত বয়স্কের স্বার্থ জড়িত থাকলে।

(২) বিবাদের পক্ষগণের মধ্যে বিদ্যমান কলহের ব্যাপারে কোন সালিশের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকলে।

(৩) মামলায় সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা কার্যরত কোন সরকারী কর্মচারী পক্ষ হয়ে থাকলে।

উত্তরঃ- বৃটিশদের আগমণের পূর্বে এদেশে পঞ্চায়েত নামে যে সংস্থা প্রচলিত ছিল তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল বিচার কার্য সম্পাদন ও ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করা। বৃটিশরা যদিও প্রথমে এ দায়িত্ব স্থানীয় সংস্থার উপর অর্পণ করেনি কিন্তু বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগেই ১৯১৯ সালের পল্লী স্বায়ত্ব শাসন আইনের মাধ্যমে ইউনিয়ন বোর্ডকে দেওয়ানী ও ফৌজদারী উভয় প্রকার মামলার বিচার করার এখতিয়ার দেয়া হয়। আমাদের দেশের দরিদ্র জনসাধারণের অধিকাংশই গ্রামে বাস করে। এ দরিদ্র জনসাধারণের পক্ষে শহরে গিয়ে দীর্ঘ দিন মামলা-মোকর্দ্দমা চালানো অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার; সুতরাং গ্রাম পর্যায়ে যদি ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা ও মামলা মোকর্দ্দমা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকে তাহলে তারা অনেক বিড়ম্বনা ও খরচের হাত থেকে অব্যাহতি লাভ করতে পারে। দ্রুত বিচার কার্যের ফলে ঝগড়া-বিবাদের তীব্রতা ও ব্যাপকতা বহুলাংশে কমে যায় এবং তা গ্রামের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর প্রথম কয়েক বছর যদিও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় বিচার কার্য করার কোন ক্ষমতা ছিল না; কিন্তু গ্রাম আদালত অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ এবং পরবর্তীতে ২০০৬ সালের গেজেট এর মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে পুনরায় বিচার কার্য সম্পাদনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিচার নিষ্পত্তিমূলক ও সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যেই এ আদালত প্রবর্তন করা হয়েছে।

২। গ্রাম আদালতের গঠনঃ-

একজন চেয়ারম্যান এবং বিবাদের প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত দু'জন সদস্য নিয়ে মোট ৫ জন সদস্যের সমন্বয়ে গ্রাম আদালত গঠিত হয়। প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত দু'জন সদস্যের একজন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হবেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান হবেন। তবে প্রকাশ থাকে যে, অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, গ্রাম আদালতে দায়েরকৃত কোন মামলা পরিচালনার জন্য কোন পক্ষ কোন আইনজীবি নিয়োগ/মনোনীত করিতে পারিবেন না।

তবে যদি চেয়ারম্যান কোন কারণ বশতঃ তাঁর দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হন, কিংবা তাঁর নিরপেক্ষতা সম্পর্কে আপত্তি ওঠে তাহলে পরিষদের অন্য কোন সদস্য আদালতের চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করবেন। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন পক্ষ সদস্য মনোনয়ন দিতে ব্যর্থ হন তবে উক্ত মনোনয়ন ছাড়াই আদালত বৈধভাবে গঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে। যদি কোন পক্ষ ইউনিয়ন পরিষদের কোন সদস্যকে পক্ষপাতিত্বের কারণে মনোনীত করতে না পারেন তাহলে চেয়ারম্যানের অনুমতিক্রমে অন্য কোন ব্যক্তিকে মনোনীত করা যাবে।

৩। গ্রাম আদালতের এখতিয়ারঃ-

(ক) যে ইউনিয়নে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বা যেখানে অপরাধের কারণের উদ্ভব হয়েছে সে ইউনিয়নের ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে গ্রাম আদালত সীমাবদ্ধ থাকবে।

(খ) যখন কোন অপরাধ এক ইউনিয়নে সংঘটিত হয়েছে কিন্তু অপরাধীগণ অন্য ইউনিয়নের বাসিন্দা তখন যে ইউনিয়নে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সে ইউনিয়নে গ্রাম আদালত গঠিত হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয় তাদের স্ব-স্ব ইউনিয়ন হতে সদস্য মনোনয়ন দিতে পারবেন।

৪। গ্রাম আদালতের ক্ষমতাঃ-

(ক) গ্রাম আদালত অবমাননা বা সমন অস্বীকার করা ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে জরিমানা বা জরিমানা অনাদায়ে জেল প্রদান করতে পারবে না। কিন্তু বিচারযোগ্য ফৌজদারী অপরাধ সমূহের বিচারে কেউ যদি দোষী সাব্যস্ত হন তবে আদালত দোষী ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দানের আদেশ দিতে পারেন। কিন্তু ক্ষতিপূরণ কোন ভাবেই ২৫,০০০/- (পঁচিশ হাজার) টাকার উর্দ্ধে হবে না।

(খ) দেওয়ানী মামলার গ্রাম আদালত কোন ব্যক্তির প্রাপ্য টাকা পরিশোধ অথবা সম্পত্তির প্রকৃত মালিককে সম্পত্তি বা তার দখল প্রত্যার্পণ করার আদেশ দিতে পারেন।

৫। গ্রাম আদালতের কার্যপদ্ধতিঃ- 

গ্রাম আদালত কর্তৃক বিচারযোগ্য মামলার ক্ষেত্রে বিবাদের যে কোন পক্ষ বিচার চেয়ে গ্রাম আদালত গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট ৪.০০(চার) টাকা (দেওয়ানী মামলা হলে) অথবা ২.০০(দুই) টাকা (ফৌজদারী মামলা হলে) ফি দিয়ে আবেদন করতে পারেন। আবেদন পত্রে নিম্ন লিখিত বিবরণাদি থাকতে হবেঃ-

(ক) যে ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করা হচ্ছে তার নাম;

(খ) আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়;

(গ) বিবাদীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়;

(ঘ) যে ইউনিয়নে অপরাধ ঘটেছে অথবা মামলার কারণের সৃষ্টি হয়েছে তার নাম;

(ঙ) সংক্ষিপ্ত বিবরণাদিসহ অভিযোগ বা দাবীর প্রকৃতি ও পরিমাণ;

(চ) প্রার্থীত প্রতিকার;

(ছ) আবেদনকারী লিখিত আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করবেন।

উল্লেখ্য যে, কোন অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন আবেদন করা যাবে না। চেয়ারম্যান অভিযোগ অমূলক মনে করলে আবেদন নাকচ করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে নাকচের কারণ লিখে আবেদনপত্র আবেদনকারীকে ফেরত দিতে হবে।

নাকচের আদেশ অসৎ উদ্দেশ্য দেয়া হয়েছে বা মূলত অন্যায় করা হয়েছে এ কারণ দেখিয়ে বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি আবেদন অগ্রাহ্য করার তারিখ হতে ৩০(ত্রিশ) দিনের মধ্যে পুনঃ বিবেচনার জন্য যথাযথ এখতিয়ার সম্পন্ন সহকারী জজের (মুন্সেফ) নিকট আবেদন করতে পারেন। সহকারী জজ (মুন্সেফ) যদি মনে করেন যে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান যে আদেশ দিয়েছেন তা অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত বা যথার্থই অন্যায় তাহলে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে আবেদনপত্র গ্রহণ করার জন্য লিখিত নির্দেশ দিয়ে আবেদনকারীকে তা ফেরত দিবেন। 

আবেদনপত্র গৃহীত হলে ১ নং ফরমে রক্ষিত রেজিষ্টার বহিতে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে। রেজিষ্ট্রী করার পর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তারিখ ও সময় নির্দিষ্ট করে আবেদনকারীকে উপস্থিত হতে নির্দেশ দিবেন এবং বিবাদীকেও অনুরূপ নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় হাজির হবার জন্য সমন দিবেন। যে ব্যক্তিকে সমন দেয়া হবে, সে ব্যক্তির নিকট তা পাঠিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সমন জারী করতে হবে। সমনের অন্য প্রস্তের উল্টো পৃষ্ঠায় সমন প্রাপক প্রাপ্তি সূচক স্বাক্ষর দান করবেন। যদি সমন ব্যক্তিগতভাবে জারী করা সম্ভব না হয় তাহলে সমন জারী কারক কর্মচারী সমনের এক প্রস্ত বিবাদীর বসত বাড়ীর কোন প্রকাশ্য স্থানে লটকিয়ে দিবেন এবং এতদ্বারা সমন যথাযথভাবে জারী করা হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার বাইরে বসবাসরত ব্যক্তিকে রেজিষ্ট্রী ডাকযোগে (প্রাপ্তি বিচারপত্র সহ) সমন পাঠাতে হবে। বিবাদীর নিকট ২ নং ফরমে সমন পাঠাতে হবে। সমন জারীর জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, তা বাদীকে বহন করতে হবে। সমন জারী করার ৭(সাত) দিনের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পক্ষদ্বয়কে তাদের সদস্য মনোনীত করতে বলবেন এবং তাদের মনোনীত সদস্য নিয়ে চেয়ার‌ম্যান গ্রাম আদালত গঠন করবেন। গ্রাম আদালত গঠিত হবার পর চেয়ারম্যান বিবাদীকে ৩(তিন) দিনের মধ্যে আবেদনের বিরুদ্ধে তার লিখিত আপত্তি দাখিল করার জন্য নির্দেশ দিবেন। গ্রাম আদালতের অধিবেশনের তারিখ ও সময় নির্ধারিত করে পক্ষদ্বয়কে নিজ নিজ মামলার সমর্থনে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষী আনয়ন করার জন্য চেয়ারম্যান নির্দেশ দিবেন। চেয়ারম্যান নির্ধারিত তারিখে মামলার বিচার করবেন। গ্রাম আদালত সময়ে সময়ে শুনানী মূলতবী রাখতে পারে। কিন্তু মূলতবীর মেয়াদ কোনভাবেই ৭(সাত) দিনের বেশী হবে না। চেয়ারম্যান স্বাক্ষীকে শপথ করিয়ে তার বক্তব্য রাখার জন্য বলবেন এবং তার বক্তব্যের সারমর্ম লিপিবদ্ধ করবেন বা করাবেন। বিচারে যে কোন পর্যায়ে গ্রাম আদালত স্থানীয়ভাবে তদন্ত করতে পারেন।

যদি আবেদনকারী নির্ধারিত তারিখে হাজির হতে ব্যর্থ হন এবং চেয়ারম্যান যদি মনে করেন আবেদনকারী মামলা পরিচালনায় অবহেলা করছেন তাহলে তিনি আবেদন নাকচ করতে পারেন। নাকচ হবার ১০(দশ) দিনের মধ্যে আবেদনকারী পূর্নবহালের জন্য লিখিতভাবে চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন করলে চেয়ারম্যান আবেদনটি পূর্নবহাল করে মামলার তারিখ নির্দিষ্ট করবেন।

অনুরূপভাবে বিবাদীর অবহেলাজনিত অনুপস্থিতির কারণে তার অনুপস্থিতিতেই চেয়ারম্যান মামলার শুনানী ও নিষ্পত্তি করবেন। এক্ষেত্রে ১০(দশ) দিনের মধ্যে বিবাদী চেয়ারম্যানের নিকট লিখিতভাবে প্রতিকারের জন্য আবেদন করবেন। অনুপস্থিতির কারণ সন্তোষজনক বলে প্রতীয়মাণ হলে চেয়ারম্যান মামলাটি পূর্নবহাল করে পূনঃ শুনানীর জন্য তারিখ ধার্য করবেন।

৬। গ্রাম আদালতের সিদ্ধান্তঃ-

গ্রাম আদালতের রায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে, যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারা সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে, তার অনুপাত রায়ে অবশ্যই উল্লেখ থাকবে। রায়ের পর ৪ নং ফরমে একটি ডিক্রী প্রস্তুত করতে হবে।

গ্রাম আদালতে সিদ্ধান্ত যদি সর্বসম্মত বা চার এক ভোটে গৃহীত হয় তাহলে উক্ত সিদ্ধান্ত পক্ষদ্বয়ের উপর বাধ্যতামূলক হবে এবং সেক্ষেত্রে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনরূপ আপীল চলবে না।

যদি তিন-দুই এ কোন সিদ্ধান্ত হয় তবে সে সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক হবে না। সিদ্ধান্ত ঘোষণার ৩০(ত্রিশ) দিনের মধ্যে যে কোন পক্ষ ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিষ্ট্রেট (কগনিজেন্স আদালত) এবং দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রে সহকারী জজ (মুন্সেফ) এর আদালতে আপীল করতে পারবেন।

গ্রাম আদালত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডিক্রী বা ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানের নির্দেশ দিবেন তবে তা ৬(ছয়) মাসের অধিক হবে না।

৭। গ্রাম আদালতের আদেশ (ডিক্রী) বলবৎকরণঃ-

চেয়ারম্যান ৫ নং ফরমে ডিক্রী রেজিষ্টারে ডিক্রী লিপিবদ্ধ করবেন। গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য ডিক্রী দেবার পর নির্ধারিত তারিখের মধ্যে ডিক্রী বাবদ অর্থ জমা না দিলে গ্রাম আদালত ডিক্রীটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এর নিকট প্রেরণ করবেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বকেয়া কর আদায়ের পদ্ধতি অনুসরণ করে ডিক্রীর অর্থ আদায় করে ডিক্রীদারকে প্রদান করবেন।

কিন্তু উল্লেখ্য যে, আর্থিক ক্ষতিপূরণ ছাড়া অন্য কোন কিছু ক্ষতিপূরণ হিসাবে প্রদানের জন্য গ্রাম আদালত ডিক্রী প্রদান করলে, গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান ডিক্রীটি এখতিয়ার সম্পন্ন সহকারী জজ (মুন্সেফ) এর নিকট কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করবেন। সহকারী জজ (মুন্সেফ) উক্ত ডিক্রী কার্যকরীর বিষয়ে এমণভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন যেন তার আদালতই ডিক্রীটি প্রদান করেছেন।

৮। গ্রাম আদালতের জরিমানাঃ-

আইন সঙ্গত কারণ ছাড়া নিম্নলিখিত অপরাধের জন্য কোন ব্যক্তি গ্রাম আদালত অবমাননার দোষে দোষী হতে পারেনঃ-

(ক) আদালত চলাকালীন আদালতকে বা তার কোন সদস্যকে কাজ চলাকালে অপমান করা।

(খ) আদালতের কোন কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা।

(গ) আদালতের কোন বৈধ প্রশ্নের উত্তর দানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন।

(ঘ) আদালতের আদেশ সত্ত্বেও কোন দলিল দাখিল বা অর্পণ করতে ব্যর্থ হওয়া।

(ঙ) সত্য কথা বলার জন্য শপৎ নিতে অস্বীকার বা আদালতের নির্দেশানুসারে প্রদত্ত জবানবন্দীতে দস্তখত করতে অস্বীকার করা।

উল্লিখিত যে কোন একটি অপরাধের জন্য গ্রাম আদালত সংশ্লিষ্ট অপরাধীকে তার কৃত অপরাধের জন্য ৫০০/- (পাঁচশত) টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন। বিচারের স্বার্থে গ্রাম আদালতে যে কোন ব্যক্তিকে হাজির হতে/সাক্ষ্য দিতে/দলিল দাখিল করতে সমন দিতে পারে। আইন সঙ্গত অজুহাত ব্যতিরেকে সমন প্রাপ্ত ব্যক্তি আদালতে হাজির হতে বা রাষ্ট্রীয় গোপনীয় নয় এমন দলিলাদি দাখিল করতে ব্যর্থ হলে তাকে বক্তব্য পেশের সুযোগ দেবার পর সংশ্লিষ্ট আদালত উক্ত ব্যক্তিকে অনধিক ২৫০/- (দুইশত পঞ্চাশ) টাকা জরিমানা করতে পারেন।

৯। জরিমানা আদায়ঃ-

আদালত অবমাননা বা সমন ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করার অপরাধে জরিমানা করা হলে জরিমানার অর্থ যদি পরিশোধ করা না হয় তাহলে গ্রাম আদালত তথ্য উল্লেখ করে একটি আদেশ লিখবেন এবং তা সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের নিকট পাঠাবেন। চেয়ারম্যান তা গ্রহণ করে উক্ত অর্থ ইউনিয়ন পরিষদের বকেয়া কর হিসাবে আদায় করবেন। আদায়কৃত অর্থ ইউ,পি তহবিলে জমা হবে।

১০। যে সমস্ত ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত বিচার করতে পারবে নাঃ-

(ক) ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রেঃ-

অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পূর্বে অন্য কোন আদালত কর্তৃক কোন আদালত গ্রাহ্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকে।

(খ) দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রেঃ-

(১) যখন কোন অপ্রাপ্ত বয়স্কের স্বার্থ জড়িত থাকলে।

(২) বিবাদের পক্ষগণের মধ্যে বিদ্যমান কলহের ব্যাপারে কোন সালিশের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকলে।

(৩) মামলায় সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা কার্যরত কোন সরকারী কর্মচারী পক্ষ হয়ে থাকলে।

উত্তরঃ- বৃটিশদের আগমণের পূর্বে এদেশে পঞ্চায়েত নামে যে সংস্থা প্রচলিত ছিল তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল বিচার কার্য সম্পাদন ও ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করা। বৃটিশরা যদিও প্রথমে এ দায়িত্ব স্থানীয় সংস্থার উপর অর্পণ করেনি কিন্তু বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগেই ১৯১৯ সালের পল্লী স্বায়ত্ব শাসন আইনের মাধ্যমে ইউনিয়ন বোর্ডকে দেওয়ানী ও ফৌজদারী উভয় প্রকার মামলার বিচার করার এখতিয়ার দেয়া হয়। আমাদের দেশের দরিদ্র জনসাধারণের অধিকাংশই গ্রামে বাস করে। এ দরিদ্র জনসাধারণের পক্ষে শহরে গিয়ে দীর্ঘ দিন মামলা-মোকর্দ্দমা চালানো অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার; সুতরাং গ্রাম পর্যায়ে যদি ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা ও মামলা মোকর্দ্দমা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকে তাহলে তারা অনেক বিড়ম্বনা ও খরচের হাত থেকে অব্যাহতি লাভ করতে পারে। দ্রুত বিচার কার্যের ফলে ঝগড়া-বিবাদের তীব্রতা ও ব্যাপকতা বহুলাংশে কমে যায় এবং তা গ্রামের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর প্রথম কয়েক বছর যদিও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় বিচার কার্য করার কোন ক্ষমতা ছিল না; কিন্তু গ্রাম আদালত অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ এবং পরবর্তীতে ২০০৬ সালের গেজেট এর মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে পুনরায় বিচার কার্য সম্পাদনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিচার নিষ্পত্তিমূলক ও সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যেই এ আদালত প্রবর্তন করা হয়েছে।

২। গ্রাম আদালতের গঠনঃ-

একজন চেয়ারম্যান এবং বিবাদের প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত দু'জন সদস্য নিয়ে মোট ৫ জন সদস্যের সমন্বয়ে গ্রাম আদালত গঠিত হয়। প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত দু'জন সদস্যের একজন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হবেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান হবেন। তবে প্রকাশ থাকে যে, অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, গ্রাম আদালতে দায়েরকৃত কোন মামলা পরিচালনার জন্য কোন পক্ষ কোন আইনজীবি নিয়োগ/মনোনীত করিতে পারিবেন না।

তবে যদি চেয়ারম্যান কোন কারণ বশতঃ তাঁর দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হন, কিংবা তাঁর নিরপেক্ষতা সম্পর্কে আপত্তি ওঠে তাহলে পরিষদের অন্য কোন সদস্য আদালতের চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করবেন। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন পক্ষ সদস্য মনোনয়ন দিতে ব্যর্থ হন তবে উক্ত মনোনয়ন ছাড়াই আদালত বৈধভাবে গঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে। যদি কোন পক্ষ ইউনিয়ন পরিষদের কোন সদস্যকে পক্ষপাতিত্বের কারণে মনোনীত করতে না পারেন তাহলে চেয়ারম্যানের অনুমতিক্রমে অন্য কোন ব্যক্তিকে মনোনীত করা যাবে।

৩। গ্রাম আদালতের এখতিয়ারঃ-

(ক) যে ইউনিয়নে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বা যেখানে অপরাধের কারণের উদ্ভব হয়েছে সে ইউনিয়নের ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে গ্রাম আদালত সীমাবদ্ধ থাকবে।

(খ) যখন কোন অপরাধ এক ইউনিয়নে সংঘটিত হয়েছে কিন্তু অপরাধীগণ অন্য ইউনিয়নের বাসিন্দা তখন যে ইউনিয়নে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সে ইউনিয়নে গ্রাম আদালত গঠিত হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয় তাদের স্ব-স্ব ইউনিয়ন হতে সদস্য মনোনয়ন দিতে পারবেন।

৪। গ্রাম আদালতের ক্ষমতাঃ-

(ক) গ্রাম আদালত অবমাননা বা সমন অস্বীকার করা ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে জরিমানা বা জরিমানা অনাদায়ে জেল প্রদান করতে পারবে না। কিন্তু বিচারযোগ্য ফৌজদারী অপরাধ সমূহের বিচারে কেউ যদি দোষী সাব্যস্ত হন তবে আদালত দোষী ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দানের আদেশ দিতে পারেন। কিন্তু ক্ষতিপূরণ কোন ভাবেই ২৫,০০০/- (পঁচিশ হাজার) টাকার উর্দ্ধে হবে না।

(খ) দেওয়ানী মামলার গ্রাম আদালত কোন ব্যক্তির প্রাপ্য টাকা পরিশোধ অথবা সম্পত্তির প্রকৃত মালিককে সম্পত্তি বা তার দখল প্রত্যার্পণ করার আদেশ দিতে পারেন।

৫। গ্রাম আদালতের কার্যপদ্ধতিঃ- 

গ্রাম আদালত কর্তৃক বিচারযোগ্য মামলার ক্ষেত্রে বিবাদের যে কোন পক্ষ বিচার চেয়ে গ্রাম আদালত গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট ৪.০০(চার) টাকা (দেওয়ানী মামলা হলে) অথবা ২.০০(দুই) টাকা (ফৌজদারী মামলা হলে) ফি দিয়ে আবেদন করতে পারেন। আবেদন পত্রে নিম্ন লিখিত বিবরণাদি থাকতে হবেঃ-

(ক) যে ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করা হচ্ছে তার নাম;

(খ) আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়;

(গ) বিবাদীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়;

(ঘ) যে ইউনিয়নে অপরাধ ঘটেছে অথবা মামলার কারণের সৃষ্টি হয়েছে তার নাম;

(ঙ) সংক্ষিপ্ত বিবরণাদিসহ অভিযোগ বা দাবীর প্রকৃতি ও পরিমাণ;

(চ) প্রার্থীত প্রতিকার;

(ছ) আবেদনকারী লিখিত আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করবেন।

উল্লেখ্য যে, কোন অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন আবেদন করা যাবে না। চেয়ারম্যান অভিযোগ অমূলক মনে করলে আবেদন নাকচ করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে নাকচের কারণ লিখে আবেদনপত্র আবেদনকারীকে ফেরত দিতে হবে।

নাকচের আদেশ অসৎ উদ্দেশ্য দেয়া হয়েছে বা মূলত অন্যায় করা হয়েছে এ কারণ দেখিয়ে বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি আবেদন অগ্রাহ্য করার তারিখ হতে ৩০(ত্রিশ) দিনের মধ্যে পুনঃ বিবেচনার জন্য যথাযথ এখতিয়ার সম্পন্ন সহকারী জজের (মুন্সেফ) নিকট আবেদন করতে পারেন। সহকারী জজ (মুন্সেফ) যদি মনে করেন যে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান যে আদেশ দিয়েছেন তা অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত বা যথার্থই অন্যায় তাহলে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে আবেদনপত্র গ্রহণ করার জন্য লিখিত নির্দেশ দিয়ে আবেদনকারীকে তা ফেরত দিবেন। 

আবেদনপত্র গৃহীত হলে ১ নং ফরমে রক্ষিত রেজিষ্টার বহিতে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে। রেজিষ্ট্রী করার পর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তারিখ ও সময় নির্দিষ্ট করে আবেদনকারীকে উপস্থিত হতে নির্দেশ দিবেন এবং বিবাদীকেও অনুরূপ নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় হাজির হবার জন্য সমন দিবেন। যে ব্যক্তিকে সমন দেয়া হবে, সে ব্যক্তির নিকট তা পাঠিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সমন জারী করতে হবে। সমনের অন্য প্রস্তের উল্টো পৃষ্ঠায় সমন প্রাপক প্রাপ্তি সূচক স্বাক্ষর দান করবেন। যদি সমন ব্যক্তিগতভাবে জারী করা সম্ভব না হয় তাহলে সমন জারী কারক কর্মচারী সমনের এক প্রস্ত বিবাদীর বসত বাড়ীর কোন প্রকাশ্য স্থানে লটকিয়ে দিবেন এবং এতদ্বারা সমন যথাযথভাবে জারী করা হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার বাইরে বসবাসরত ব্যক্তিকে রেজিষ্ট্রী ডাকযোগে (প্রাপ্তি বিচারপত্র সহ) সমন পাঠাতে হবে। বিবাদীর নিকট ২ নং ফরমে সমন পাঠাতে হবে। সমন জারীর জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, তা বাদীকে বহন করতে হবে। সমন জারী করার ৭(সাত) দিনের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পক্ষদ্বয়কে তাদের সদস্য মনোনীত করতে বলবেন এবং তাদের মনোনীত সদস্য নিয়ে চেয়ার‌ম্যান গ্রাম আদালত গঠন করবেন। গ্রাম আদালত গঠিত হবার পর চেয়ারম্যান বিবাদীকে ৩(তিন) দিনের মধ্যে আবেদনের বিরুদ্ধে তার লিখিত আপত্তি দাখিল করার জন্য নির্দেশ দিবেন। গ্রাম আদালতের অধিবেশনের তারিখ ও সময় নির্ধারিত করে পক্ষদ্বয়কে নিজ নিজ মামলার সমর্থনে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষী আনয়ন করার জন্য চেয়ারম্যান নির্দেশ দিবেন। চেয়ারম্যান নির্ধারিত তারিখে মামলার বিচার করবেন। গ্রাম আদালত সময়ে সময়ে শুনানী মূলতবী রাখতে পারে। কিন্তু মূলতবীর মেয়াদ কোনভাবেই ৭(সাত) দিনের বেশী হবে না। চেয়ারম্যান স্বাক্ষীকে শপথ করিয়ে তার বক্তব্য রাখার জন্য বলবেন এবং তার বক্তব্যের সারমর্ম লিপিবদ্ধ করবেন বা করাবেন। বিচারে যে কোন পর্যায়ে গ্রাম আদালত স্থানীয়ভাবে তদন্ত করতে পারেন।

যদি আবেদনকারী নির্ধারিত তারিখে হাজির হতে ব্যর্থ হন এবং চেয়ারম্যান যদি মনে করেন আবেদনকারী মামলা পরিচালনায় অবহেলা করছেন তাহলে তিনি আবেদন নাকচ করতে পারেন। নাকচ হবার ১০(দশ) দিনের মধ্যে আবেদনকারী পূর্নবহালের জন্য লিখিতভাবে চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন করলে চেয়ারম্যান আবেদনটি পূর্নবহাল করে মামলার তারিখ নির্দিষ্ট করবেন।

অনুরূপভাবে বিবাদীর অবহেলাজনিত অনুপস্থিতির কারণে তার অনুপস্থিতিতেই চেয়ারম্যান মামলার শুনানী ও নিষ্পত্তি করবেন। এক্ষেত্রে ১০(দশ) দিনের মধ্যে বিবাদী চেয়ারম্যানের নিকট লিখিতভাবে প্রতিকারের জন্য আবেদন করবেন। অনুপস্থিতির কারণ সন্তোষজনক বলে প্রতীয়মাণ হলে চেয়ারম্যান মামলাটি পূর্নবহাল করে পূনঃ শুনানীর জন্য তারিখ ধার্য করবেন।

৬। গ্রাম আদালতের সিদ্ধান্তঃ-

গ্রাম আদালতের রায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে, যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারা সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে, তার অনুপাত রায়ে অবশ্যই উল্লেখ থাকবে। রায়ের পর ৪ নং ফরমে একটি ডিক্রী প্রস্তুত করতে হবে।

গ্রাম আদালতে সিদ্ধান্ত যদি সর্বসম্মত বা চার এক ভোটে গৃহীত হয় তাহলে উক্ত সিদ্ধান্ত পক্ষদ্বয়ের উপর বাধ্যতামূলক হবে এবং সেক্ষেত্রে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনরূপ আপীল চলবে না।

যদি তিন-দুই এ কোন সিদ্ধান্ত হয় তবে সে সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক হবে না। সিদ্ধান্ত ঘোষণার ৩০(ত্রিশ) দিনের মধ্যে যে কোন পক্ষ ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিষ্ট্রেট (কগনিজেন্স আদালত) এবং দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রে সহকারী জজ (মুন্সেফ) এর আদালতে আপীল করতে পারবেন।

গ্রাম আদালত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডিক্রী বা ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানের নির্দেশ দিবেন তবে তা ৬(ছয়) মাসের অধিক হবে না।

৭। গ্রাম আদালতের আদেশ (ডিক্রী) বলবৎকরণঃ-

চেয়ারম্যান ৫ নং ফরমে ডিক্রী রেজিষ্টারে ডিক্রী লিপিবদ্ধ করবেন। গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য ডিক্রী দেবার পর নির্ধারিত তারিখের মধ্যে ডিক্রী বাবদ অর্থ জমা না দিলে গ্রাম আদালত ডিক্রীটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এর নিকট প্রেরণ করবেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বকেয়া কর আদায়ের পদ্ধতি অনুসরণ করে ডিক্রীর অর্থ আদায় করে ডিক্রীদারকে প্রদান করবেন।

কিন্তু উল্লেখ্য যে, আর্থিক ক্ষতিপূরণ ছাড়া অন্য কোন কিছু ক্ষতিপূরণ হিসাবে প্রদানের জন্য গ্রাম আদালত ডিক্রী প্রদান করলে, গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান ডিক্রীটি এখতিয়ার সম্পন্ন সহকারী জজ (মুন্সেফ) এর নিকট কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করবেন। সহকারী জজ (মুন্সেফ) উক্ত ডিক্রী কার্যকরীর বিষয়ে এমণভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন যেন তার আদালতই ডিক্রীটি প্রদান করেছেন।

৮। গ্রাম আদালতের জরিমানাঃ-

আইন সঙ্গত কারণ ছাড়া নিম্নলিখিত অপরাধের জন্য কোন ব্যক্তি গ্রাম আদালত অবমাননার দোষে দোষী হতে পারেনঃ-

(ক) আদালত চলাকালীন আদালতকে বা তার কোন সদস্যকে কাজ চলাকালে অপমান করা।

(খ) আদালতের কোন কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা।

(গ) আদালতের কোন বৈধ প্রশ্নের উত্তর দানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন।

(ঘ) আদালতের আদেশ সত্ত্বেও কোন দলিল দাখিল বা অর্পণ করতে ব্যর্থ হওয়া।

(ঙ) সত্য কথা বলার জন্য শপৎ নিতে অস্বীকার বা আদালতের নির্দেশানুসারে প্রদত্ত জবানবন্দীতে দস্তখত করতে অস্বীকার করা।

উল্লিখিত যে কোন একটি অপরাধের জন্য গ্রাম আদালত সংশ্লিষ্ট অপরাধীকে তার কৃত অপরাধের জন্য ৫০০/- (পাঁচশত) টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন। বিচারের স্বার্থে গ্রাম আদালতে যে কোন ব্যক্তিকে হাজির হতে/সাক্ষ্য দিতে/দলিল দাখিল করতে সমন দিতে পারে। আইন সঙ্গত অজুহাত ব্যতিরেকে সমন প্রাপ্ত ব্যক্তি আদালতে হাজির হতে বা রাষ্ট্রীয় গোপনীয় নয় এমন দলিলাদি দাখিল করতে ব্যর্থ হলে তাকে বক্তব্য পেশের সুযোগ দেবার পর সংশ্লিষ্ট আদালত উক্ত ব্যক্তিকে অনধিক ২৫০/- (দুইশত পঞ্চাশ) টাকা জরিমানা করতে পারেন।

৯। জরিমানা আদায়ঃ-

আদালত অবমাননা বা সমন ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করার অপরাধে জরিমানা করা হলে জরিমানার অর্থ যদি পরিশোধ করা না হয় তাহলে গ্রাম আদালত তথ্য উল্লেখ করে একটি আদেশ লিখবেন এবং তা সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের নিকট পাঠাবেন। চেয়ারম্যান তা গ্রহণ করে উক্ত অর্থ ইউনিয়ন পরিষদের বকেয়া কর হিসাবে আদায় করবেন। আদায়কৃত অর্থ ইউ,পি তহবিলে জমা হবে।

১০। যে সমস্ত ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত বিচার করতে পারবে নাঃ-

(ক) ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রেঃ-

অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পূর্বে অন্য কোন আদালত কর্তৃক কোন আদালত গ্রাহ্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকে।

(খ) দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রেঃ-

(১) যখন কোন অপ্রাপ্ত বয়স্কের স্বার্থ জড়িত থাকলে।

(২) বিবাদের পক্ষগণের মধ্যে বিদ্যমান কলহের ব্যাপারে কোন সালিশের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকলে।

(৩) মামলায় সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা কার্যরত কোন সরকারী কর্মচারী পক্ষ হয়ে থাকলে।

উত্তরঃ- বৃটিশদের আগমণের পূর্বে এদেশে পঞ্চায়েত নামে যে সংস্থা প্রচলিত ছিল তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল বিচার কার্য সম্পাদন ও ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করা। বৃটিশরা যদিও প্রথমে এ দায়িত্ব স্থানীয় সংস্থার উপর অর্পণ করেনি কিন্তু বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগেই ১৯১৯ সালের পল্লী স্বায়ত্ব শাসন আইনের মাধ্যমে ইউনিয়ন বোর্ডকে দেওয়ানী ও ফৌজদারী উভয় প্রকার মামলার বিচার করার এখতিয়ার দেয়া হয়। আমাদের দেশের দরিদ্র জনসাধারণের অধিকাংশই গ্রামে বাস করে। এ দরিদ্র জনসাধারণের পক্ষে শহরে গিয়ে দীর্ঘ দিন মামলা-মোকর্দ্দমা চালানো অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার; সুতরাং গ্রাম পর্যায়ে যদি ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা ও মামলা মোকর্দ্দমা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকে তাহলে তারা অনেক বিড়ম্বনা ও খরচের হাত থেকে অব্যাহতি লাভ করতে পারে। দ্রুত বিচার কার্যের ফলে ঝগড়া-বিবাদের তীব্রতা ও ব্যাপকতা বহুলাংশে কমে যায় এবং তা গ্রামের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর প্রথম কয়েক বছর যদিও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থানীয় বিচার কার্য করার কোন ক্ষমতা ছিল না; কিন্তু গ্রাম আদালত অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ এবং পরবর্তীতে ২০০৬ সালের গেজেট এর মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে পুনরায় বিচার কার্য সম্পাদনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিচার নিষ্পত্তিমূলক ও সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যেই এ আদালত প্রবর্তন করা হয়েছে।

২। গ্রাম আদালতের গঠনঃ-

একজন চেয়ারম্যান এবং বিবাদের প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত দু'জন সদস্য নিয়ে মোট ৫ জন সদস্যের সমন্বয়ে গ্রাম আদালত গঠিত হয়। প্রত্যেক পক্ষ কর্তৃক মনোনীত দু'জন সদস্যের একজন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হবেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান হবেন। তবে প্রকাশ থাকে যে, অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, গ্রাম আদালতে দায়েরকৃত কোন মামলা পরিচালনার জন্য কোন পক্ষ কোন আইনজীবি নিয়োগ/মনোনীত করিতে পারিবেন না।

তবে যদি চেয়ারম্যান কোন কারণ বশতঃ তাঁর দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হন, কিংবা তাঁর নিরপেক্ষতা সম্পর্কে আপত্তি ওঠে তাহলে পরিষদের অন্য কোন সদস্য আদালতের চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করবেন। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন পক্ষ সদস্য মনোনয়ন দিতে ব্যর্থ হন তবে উক্ত মনোনয়ন ছাড়াই আদালত বৈধভাবে গঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে। যদি কোন পক্ষ ইউনিয়ন পরিষদের কোন সদস্যকে পক্ষপাতিত্বের কারণে মনোনীত করতে না পারেন তাহলে চেয়ারম্যানের অনুমতিক্রমে অন্য কোন ব্যক্তিকে মনোনীত করা যাবে।

৩। গ্রাম আদালতের এখতিয়ারঃ-

(ক) যে ইউনিয়নে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বা যেখানে অপরাধের কারণের উদ্ভব হয়েছে সে ইউনিয়নের ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে গ্রাম আদালত সীমাবদ্ধ থাকবে।

(খ) যখন কোন অপরাধ এক ইউনিয়নে সংঘটিত হয়েছে কিন্তু অপরাধীগণ অন্য ইউনিয়নের বাসিন্দা তখন যে ইউনিয়নে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সে ইউনিয়নে গ্রাম আদালত গঠিত হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয় তাদের স্ব-স্ব ইউনিয়ন হতে সদস্য মনোনয়ন দিতে পারবেন।

৪। গ্রাম আদালতের ক্ষমতাঃ-

(ক) গ্রাম আদালত অবমাননা বা সমন অস্বীকার করা ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে জরিমানা বা জরিমানা অনাদায়ে জেল প্রদান করতে পারবে না। কিন্তু বিচারযোগ্য ফৌজদারী অপরাধ সমূহের বিচারে কেউ যদি দোষী সাব্যস্ত হন তবে আদালত দোষী ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দানের আদেশ দিতে পারেন। কিন্তু ক্ষতিপূরণ কোন ভাবেই ২৫,০০০/- (পঁচিশ হাজার) টাকার উর্দ্ধে হবে না।

(খ) দেওয়ানী মামলার গ্রাম আদালত কোন ব্যক্তির প্রাপ্য টাকা পরিশোধ অথবা সম্পত্তির প্রকৃত মালিককে সম্পত্তি বা তার দখল প্রত্যার্পণ করার আদেশ দিতে পারেন।

৫। গ্রাম আদালতের কার্যপদ্ধতিঃ- 

গ্রাম আদালত কর্তৃক বিচারযোগ্য মামলার ক্ষেত্রে বিবাদের যে কোন পক্ষ বিচার চেয়ে গ্রাম আদালত গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট ৪.০০(চার) টাকা (দেওয়ানী মামলা হলে) অথবা ২.০০(দুই) টাকা (ফৌজদারী মামলা হলে) ফি দিয়ে আবেদন করতে পারেন। আবেদন পত্রে নিম্ন লিখিত বিবরণাদি থাকতে হবেঃ-

(ক) যে ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করা হচ্ছে তার নাম;

(খ) আবেদনকারীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়;

(গ) বিবাদীর নাম, ঠিকানা ও পরিচয়;

(ঘ) যে ইউনিয়নে অপরাধ ঘটেছে অথবা মামলার কারণের সৃষ্টি হয়েছে তার নাম;

(ঙ) সংক্ষিপ্ত বিবরণাদিসহ অভিযোগ বা দাবীর প্রকৃতি ও পরিমাণ;

(চ) প্রার্থীত প্রতিকার;

(ছ) আবেদনকারী লিখিত আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করবেন।

উল্লেখ্য যে, কোন অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন আবেদন করা যাবে না। চেয়ারম্যান অভিযোগ অমূলক মনে করলে আবেদন নাকচ করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে নাকচের কারণ লিখে আবেদনপত্র আবেদনকারীকে ফেরত দিতে হবে।

নাকচের আদেশ অসৎ উদ্দেশ্য দেয়া হয়েছে বা মূলত অন্যায় করা হয়েছে এ কারণ দেখিয়ে বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি আবেদন অগ্রাহ্য করার তারিখ হতে ৩০(ত্রিশ) দিনের মধ্যে পুনঃ বিবেচনার জন্য যথাযথ এখতিয়ার সম্পন্ন সহকারী জজের (মুন্সেফ) নিকট আবেদন করতে পারেন। সহকারী জজ (মুন্সেফ) যদি মনে করেন যে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান যে আদেশ দিয়েছেন তা অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত বা যথার্থই অন্যায় তাহলে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে আবেদনপত্র গ্রহণ করার জন্য লিখিত নির্দেশ দিয়ে আবেদনকারীকে তা ফেরত দিবেন। 

আবেদনপত্র গৃহীত হলে ১ নং ফরমে রক্ষিত রেজিষ্টার বহিতে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে। রেজিষ্ট্রী করার পর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তারিখ ও সময় নির্দিষ্ট করে আবেদনকারীকে উপস্থিত হতে নির্দেশ দিবেন এবং বিবাদীকেও অনুরূপ নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় হাজির হবার জন্য সমন দিবেন। যে ব্যক্তিকে সমন দেয়া হবে, সে ব্যক্তির নিকট তা পাঠিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সমন জারী করতে হবে। সমনের অন্য প্রস্তের উল্টো পৃষ্ঠায় সমন প্রাপক প্রাপ্তি সূচক স্বাক্ষর দান করবেন। যদি সমন ব্যক্তিগতভাবে জারী করা সম্ভব না হয় তাহলে সমন জারী কারক কর্মচারী সমনের এক প্রস্ত বিবাদীর বসত বাড়ীর কোন প্রকাশ্য স্থানে লটকিয়ে দিবেন এবং এতদ্বারা সমন যথাযথভাবে জারী করা হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার বাইরে বসবাসরত ব্যক্তিকে রেজিষ্ট্রী ডাকযোগে (প্রাপ্তি বিচারপত্র সহ) সমন পাঠাতে হবে। বিবাদীর নিকট ২ নং ফরমে সমন পাঠাতে হবে। সমন জারীর জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, তা বাদীকে বহন করতে হবে। সমন জারী করার ৭(সাত) দিনের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পক্ষদ্বয়কে তাদের সদস্য মনোনীত করতে বলবেন এবং তাদের মনোনীত সদস্য নিয়ে চেয়ার‌ম্যান গ্রাম আদালত গঠন করবেন। গ্রাম আদালত গঠিত হবার পর চেয়ারম্যান বিবাদীকে ৩(তিন) দিনের মধ্যে আবেদনের বিরুদ্ধে তার লিখিত আপত্তি দাখিল করার জন্য নির্দেশ দিবেন। গ্রাম আদালতের অধিবেশনের তারিখ ও সময় নির্ধারিত করে পক্ষদ্বয়কে নিজ নিজ মামলার সমর্থনে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষী আনয়ন করার জন্য চেয়ারম্যান নির্দেশ দিবেন। চেয়ারম্যান নির্ধারিত তারিখে মামলার বিচার করবেন। গ্রাম আদালত সময়ে সময়ে শুনানী মূলতবী রাখতে পারে। কিন্তু মূলতবীর মেয়াদ কোনভাবেই ৭(সাত) দিনের বেশী হবে না। চেয়ারম্যান স্বাক্ষীকে শপথ করিয়ে তার বক্তব্য রাখার জন্য বলবেন এবং তার বক্তব্যের সারমর্ম লিপিবদ্ধ করবেন বা করাবেন। বিচারে যে কোন পর্যায়ে গ্রাম আদালত স্থানীয়ভাবে তদন্ত করতে পারেন।

যদি আবেদনকারী নির্ধারিত তারিখে হাজির হতে ব্যর্থ হন এবং চেয়ারম্যান যদি মনে করেন আবেদনকারী মামলা পরিচালনায় অবহেলা করছেন তাহলে তিনি আবেদন নাকচ করতে পারেন। নাকচ হবার ১০(দশ) দিনের মধ্যে আবেদনকারী পূর্নবহালের জন্য লিখিতভাবে চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন করলে চেয়ারম্যান আবেদনটি পূর্নবহাল করে মামলার তারিখ নির্দিষ্ট করবেন।

অনুরূপভাবে বিবাদীর অবহেলাজনিত অনুপস্থিতির কারণে তার অনুপস্থিতিতেই চেয়ারম্যান মামলার শুনানী ও নিষ্পত্তি করবেন। এক্ষেত্রে ১০(দশ) দিনের মধ্যে বিবাদী চেয়ারম্যানের নিকট লিখিতভাবে প্রতিকারের জন্য আবেদন করবেন। অনুপস্থিতির কারণ সন্তোষজনক বলে প্রতীয়মাণ হলে চেয়ারম্যান মামলাটি পূর্নবহাল করে পূনঃ শুনানীর জন্য তারিখ ধার্য করবেন।

৬। গ্রাম আদালতের সিদ্ধান্তঃ-

গ্রাম আদালতের রায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে, যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারা সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে, তার অনুপাত রায়ে অবশ্যই উল্লেখ থাকবে। রায়ের পর ৪ নং ফরমে একটি ডিক্রী প্রস্তুত করতে হবে।

গ্রাম আদালতে সিদ্ধান্ত যদি সর্বসম্মত বা চার এক ভোটে গৃহীত হয় তাহলে উক্ত সিদ্ধান্ত পক্ষদ্বয়ের উপর বাধ্যতামূলক হবে এবং সেক্ষেত্রে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনরূপ আপীল চলবে না।

যদি তিন-দুই এ কোন সিদ্ধান্ত হয় তবে সে সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক হবে না। সিদ্ধান্ত ঘোষণার ৩০(ত্রিশ) দিনের মধ্যে যে কোন পক্ষ ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিষ্ট্রেট (কগনিজেন্স আদালত) এবং দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রে সহকারী জজ (মুন্সেফ) এর আদালতে আপীল করতে পারবেন।

গ্রাম আদালত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডিক্রী বা ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানের নির্দেশ দিবেন তবে তা ৬(ছয়) মাসের অধিক হবে না।

৭। গ্রাম আদালতের আদেশ (ডিক্রী) বলবৎকরণঃ-

চেয়ারম্যান ৫ নং ফরমে ডিক্রী রেজিষ্টারে ডিক্রী লিপিবদ্ধ করবেন। গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য ডিক্রী দেবার পর নির্ধারিত তারিখের মধ্যে ডিক্রী বাবদ অর্থ জমা না দিলে গ্রাম আদালত ডিক্রীটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এর নিকট প্রেরণ করবেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বকেয়া কর আদায়ের পদ্ধতি অনুসরণ করে ডিক্রীর অর্থ আদায় করে ডিক্রীদারকে প্রদান করবেন।

কিন্তু উল্লেখ্য যে, আর্থিক ক্ষতিপূরণ ছাড়া অন্য কোন কিছু ক্ষতিপূরণ হিসাবে প্রদানের জন্য গ্রাম আদালত ডিক্রী প্রদান করলে, গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান ডিক্রীটি এখতিয়ার সম্পন্ন সহকারী জজ (মুন্সেফ) এর নিকট কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করবেন। সহকারী জজ (মুন্সেফ) উক্ত ডিক্রী কার্যকরীর বিষয়ে এমণভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন যেন তার আদালতই ডিক্রীটি প্রদান করেছেন।

৮। গ্রাম আদালতের জরিমানাঃ-

আইন সঙ্গত কারণ ছাড়া নিম্নলিখিত অপরাধের জন্য কোন ব্যক্তি গ্রাম আদালত অবমাননার দোষে দোষী হতে পারেনঃ-

(ক) আদালত চলাকালীন আদালতকে বা তার কোন সদস্যকে কাজ চলাকালে অপমান করা।

(খ) আদালতের কোন কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা।

(গ) আদালতের কোন বৈধ প্রশ্নের উত্তর দানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন।

(ঘ) আদালতের আদেশ সত্ত্বেও কোন দলিল দাখিল বা অর্পণ করতে ব্যর্থ হওয়া।

(ঙ) সত্য কথা বলার জন্য শপৎ নিতে অস্বীকার বা আদালতের নির্দেশানুসারে প্রদত্ত জবানবন্দীতে দস্তখত করতে অস্বীকার করা।

উল্লিখিত যে কোন একটি অপরাধের জন্য গ্রাম আদালত সংশ্লিষ্ট অপরাধীকে তার কৃত অপরাধের জন্য ৫০০/- (পাঁচশত) টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন। বিচারের স্বার্থে গ্রাম আদালতে যে কোন ব্যক্তিকে হাজির হতে/সাক্ষ্য দিতে/দলিল দাখিল করতে সমন দিতে পারে। আইন সঙ্গত অজুহাত ব্যতিরেকে সমন প্রাপ্ত ব্যক্তি আদালতে হাজির হতে বা রাষ্ট্রীয় গোপনীয় নয় এমন দলিলাদি দাখিল করতে ব্যর্থ হলে তাকে বক্তব্য পেশের সুযোগ দেবার পর সংশ্লিষ্ট আদালত উক্ত ব্যক্তিকে অনধিক ২৫০/- (দুইশত পঞ্চাশ) টাকা জরিমানা করতে পারেন।

৯। জরিমানা আদায়ঃ-

আদালত অবমাননা বা সমন ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করার অপরাধে জরিমানা করা হলে জরিমানার অর্থ যদি পরিশোধ করা না হয় তাহলে গ্রাম আদালত তথ্য উল্লেখ করে একটি আদেশ লিখবেন এবং তা সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের নিকট পাঠাবেন। চেয়ারম্যান তা গ্রহণ করে উক্ত অর্থ ইউনিয়ন পরিষদের বকেয়া কর হিসাবে আদায় করবেন। আদায়কৃত অর্থ ইউ,পি তহবিলে জমা হবে।

১০। যে সমস্ত ক্ষেত্রে গ্রাম আদালত বিচার করতে পারবে নাঃ-

(ক) ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রেঃ-

অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পূর্বে অন্য কোন আদালত কর্তৃক কোন আদালত গ্রাহ্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে থাকে।

(খ) দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রেঃ-

(১) যখন কোন অপ্রাপ্ত বয়স্কের স্বার্থ জড়িত থাকলে।

(২) বিবাদের পক্ষগণের মধ্যে বিদ্যমান কলহের ব্যাপারে কোন সালিশের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকলে।

(৩) মামলায় সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা কার্যরত কোন সরকারী কর্মচারী পক্ষ হয়ে থাকলে।